**২.১৮।** এই অবিনাশী, অপরিমেয় ও নিত্য দেহীর দেহসকল নশ্বর বলা হয়েছে। অতএব, হে অর্জুন, যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও।
**ব্যাখ্যা:**
**'অনাশিনঃ'** – যা কোনো কালে, কোনো কারণে বিন্দুমাত্রও পরিবর্তিত হয় না, যা ক্ষয় বা অভাবের অধীন নয়, তাকে 'অনাশী' বলা হয়, অর্থাৎ অবিনাশী।
**'অপ্রমেয়স্য'** – যা 'প্রমা'র (প্রমাণের) বিষয় নয়, অর্থাৎ যা মন ও ইন্দ্রিয়ের বিষয় নয়, তাকে 'অপ্রমেয়' (অপরিমেয়, ইন্দ্রিয়াতীত) বলা হয়। মন ও ইন্দ্রিয় তার জন্য প্রমাণস্বরূপ নয়; কেবল শাস্ত্র ও সন্তমহাত্মারাই এ বিষয়ে প্রামাণ্য। শাস্ত্র ও সন্তমহাত্মা কেবল তাদের জন্যই প্রামাণ্য যাদের বিশ্বাস আছে। যে শাস্ত্রে ও যে সন্তদের প্রতি যার বিশ্বাস, সে তাদের বাক্যই গ্রহণ করে। তাই এই সত্যটি একান্তভাবে বিশ্বাসের বিষয়, প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিষয় নয়। শাস্ত্র ও সন্তরা কাউকে তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে বাধ্য করেন না। বিশ্বাস স্থাপন বা না করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীন। যদি সে শাস্ত্র ও সন্তদের বাক্যে বিশ্বাস করে, তবে এই সত্যটি তার বিশ্বাসের বিষয় হয়; আর যদি বিশ্বাস না করে, তবে এই সত্যটি তার বিশ্বাসের বিষয় হয় না।
**'নিত্যস্য'** – এই (দেহী) নিত্য, চিরবিদ্যমান। এমন কোনো সময় নেই যখন এটি থাকে না; অর্থাৎ, এটি সর্বদা, সর্বকালে বিদ্যমান।
**'অন্তবন্ত ইমে দেহাঃ উক্তাঃ শরীরিণঃ'** – এই অবিনাশী, অপরিমেয় ও নিত্য দেহীর অন্তর্গত সমগ্র জগতের সমস্ত দেহই নশ্বর বলে উক্ত হয়েছে। তাদের নশ্বর বলার তাৎপর্য হলো, তারা প্রতিক্ষণেই বিনাশপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নেই; কেবল ধ্বংসের উপর ধ্বংস।
উপর্যুক্ত বাক্যে 'দেহী'র জন্য একবচন এবং 'দেহ'গুলির জন্য বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটি কারণ হলো, প্রতিটি জীবের তিনটি দেহ থাকে: স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ। আরেকটি কারণ হলো, একই দেহী সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত দেহে ব্যাপ্ত। পরে, চব্বিশতম শ্লোকে তাকে 'সর্বগতঃ' (সর্বব্যাপী) বলেও বর্ণনা করা হবে। এই দেহী অবিনাশী, এবং তার বলে উক্ত সমস্ত দেহই নশ্বর। যেমন অবিনাশীকে কেউ বিনাশ করতে পারে না, তেমনি নশ্বরকে কেউ অবিনাশী করতে পারে না। নশ্বরের নশ্বরতা চিরকাল থাকবে; অর্থাৎ, তার ধ্বংস নিশ্চিত।
**বিশেষ দৃষ্টি:**
এখানে, 'অন্তবন্ত ইমে দেহাঃ' এই উক্তির অর্থ হলো, এই সমস্ত দেহ যা দৃষ্ট হয়, সম্পূর্ণরূপেই নশ্বর। কিন্তু এগুলি কার দেহ? 'নিত্যস্য', 'অনাশিনঃ' – এগুলি নিত্যের, অবিনাশীর দেহ। অর্থ দাঁড়ায়, চিরবিনাশহীন নিত্য তত্ত্ব এগুলিকে নিজের বলে মনে করেছে। নিজের বলে মনে করার অর্থ হলো: সে নিজেকে দেহে স্থাপন করেছে এবং দেহকে নিজের মধ্যে স্থাপন করেছে। নিজেকে দেহে স্থাপন করায় 'অহংতা' (আমি-বোধ) উৎপন্ন হয়; আর দেহকে নিজের মধ্যে স্থাপন করায় 'মমতা' (আমার-বোধ) উৎপন্ন হয়।
সে নিজেকে যেখানে স্থাপন করে, সেখানেই 'আমি'-বোধ হয়; যেমন: নিজেকে ধনে স্থাপন করলে 'আমি ধনী'; নিজেকে রাজ্যে স্থাপন করলে 'আমি রাজা'; নিজেকে বিদ্যায় স্থাপন করলে 'আমি বিদ্বান'; নিজেকে বুদ্ধিতে স্থাপন করলে 'আমি বুদ্ধিমান'; নিজেকে সিদ্ধিতে স্থাপন করলে 'আমি সিদ্ধ'; নিজেকে দেহে স্থাপন করলে 'আমি দেহ'; ইত্যাদি।
সে যেসব বস্তুকে নিজের মধ্যে স্থাপন করে, সেখানেই 'আমার'-বোধ হয়; যেমন: পরিবারকে নিজের মধ্যে স্থাপন করলে 'পরিবার আমার'; ধনকে নিজের মধ্যে স্থাপন করলে 'ধন আমার'; বুদ্ধিকে নিজের মধ্যে স্থাপন করলে 'বুদ্ধি আমার'; দেহকে নিজের মধ্যে স্থাপন করলে 'দেহ আমার'; ইত্যাদি।
জড় বস্তুর সঙ্গে 'আমি' ও 'আমার' বোধ রাখার ফলেই সমস্ত বিকার উৎপন্ন হয়। অর্থ দাঁড়ায়, দেহ ও আত্মা পৃথক – এই বিবেককে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই সমস্ত বিকার উৎপন্ন হয়। কিন্তু যারা এই বিবেককে সম্মান ও গুরুত্ব দেন, তারাই জ্ঞানী। এমন জ্ঞানী ব্যক্তি কখনও শোক করেন না; কারণ তাদের সঠিক উপলব্ধি থাকে যে, সত্য কেবল সত্যই এবং অসত্য কেবল অসত্যই।
**'তস্মাৎ যুধ্যস্ব'** – ভগবান অর্জুনকে আদেশ করছেন: সত্য ও অসত্যকে সঠিকভাবে বুঝে তুমি যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও, অর্থাৎ, তোমার নিদিষ্ট কর্তব্য সম্পাদন কর। অর্থ দাঁড়ায়, দেহ নশ্বর এবং দেহী অবিনাশী। এই দুই – দেহ ও দেহী – এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শোকের উদ্ভবই হতে পারে না। তাই শোক পরিত্যাগ করে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও।
**বিশেষ দৃষ্টি:**
এখানে, এই দুই শ্লোকে (সপ্তদশ ও অষ্টাদশ) সত্য (সৎ) তত্ত্বকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কারণ এই সমগ্র অংশে ভগবানের উদ্দেশ্য কেবল সত্যের জ্ঞান প্রদান করা। সত্যের জ্ঞান লাভ করলে অসত্যের অপসারণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে। তখন আর কোনো প্রকারের বিন্দুমাত্র সন্দেহও থাকে না। এভাবে সত্যকে উপলব্ধি করে ও সন্দেহমুক্ত হয়ে নিজের কর্তব্য পালন করা উচিত। এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, জ্ঞানযোগ (সাংখ্যযোগ) ও কর্মযোগে কোনো বিশেষ বর্ণ বা আশ্রমের প্রয়োজনীয়তা নেই। নিজের মঙ্গলের জন্য কেউ জ্ঞানযোগ অভ্যাস করুক বা কর্মযোগ করুক, ব্যক্তির সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। তবে ব্যবহারিক পার্থিব কর্তব্যকর্মের জন্য বর্ণ ও আশ্রম অনুসারে শাস্ত্রীয় বিধান একান্ত আবশ্যক। তাই এখানে জ্ঞানযোগ অনুসারে সত্য ও অসত্যের বিশ্লেষণ করতে গিয়েও ভগবান যুদ্ধের আদেশ, অর্থাৎ কর্তব্যনিষ্ঠ কর্মের আদেশ দিচ্ছেন।
পরে, ত্রয়োদশ অধ্যায়ে, যেখানে জ্ঞানের সাধন বর্ণিত হয়েছে, সেখানেও বলা হয়েছে: 'অনাসক্তিঃ, পুত্রদারগৃহাদিষু অননুযজ্জনং' (১৩.৯), অর্থাৎ পুত্র, ভার্যা, গৃহাদির প্রতি আসক্তির নিষেধ করা হয়েছে। যদি কেবল সন্ন্যাসীরাই সাংখ্যযোগের অধিকারী হতেন, তবে পুত্র, ভার্যা ইত্যাদির প্রতি অনাসক্ত হওয়ার উপদেশের প্রয়োজন হত না, কারণ সন্ন্যাসীদের তো আদৌ পুত্র, ভার্যা ইত্যাদি থাকে না।
এইভাবে গীতা চিন্তা করলে, সাংখ্যযোগ ও কর্মযোগ উভয়েই পরমাত্মপ্রাপ্তির স্বতন্ত্র সাধনরূপে প্রমাণিত হয়। তারা কোনো বর্ণ বা আশ্রমের উপর বিন্দুমাত্রও নির্ভরশীল নয়।
**সংশ্লেষ:** পূর্ববর্তী শ্লোক পর্যন্ত যারা দেহীকে অবিনাশী বলে জানেন তাদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। এখন, সেই একই বিষয়কে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য পদ্ধতিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, যারা দেহীকে অবিনাশী বলে জানেন না তাদের অবস্থা পরবর্তী শ্লোকে বর্ণনা করা হচ্ছে।
★🔗