২.২০। এই দেহধারী আত্মা কখনও জন্মগ্রহণ করে না, আবার কখনও মৃত্যুবরণও করে না; একবার হয়ে গেলে এর আর অস্তিত্ব লোপ পায় না। এটি অজ, নিত্য, শাশ্বত ও পুরাতন। দেহ নিহত হলেও এটি নিহত হয় না।
**ভাষ্য:** দেহ ছয় প্রকার পরিবর্তনের অধীন: জন্ম, স্থিতি, পরিবর্তন, বৃদ্ধি, ক্ষয় ও ধ্বংস। এই দেহধারী আত্মা এই ছয় প্রকার পরিবর্তন থেকে মুক্ত—প্রভু এই শ্লোকে এটাই ব্যাখ্যা করেছেন।
'ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্'—দেহ যেমন জন্মগ্রহণ করে, এই দেহধারী আত্মা কোনো কালেই জন্মগ্রহণ করে না। এটি চিরকাল ছিল। এই দেহধারী আত্মাকে নিজের অংশ বলে ঘোষণা করতে গিয়ে প্রভু একে 'সনাতন' বলেছেন: "জীবলোকে আমার এই সনাতন অংশ" (১৫.৭)। এই দেহধারী আত্মা কখনও মরেও না। যা জন্মগ্রহণ করে, শুধু সেই মরে, এবং 'মরা' শব্দটি তখনই প্রযোজ্য হয় যখন স্থূল দেহ ও প্রাণশক্তির বিচ্ছেদ ঘটে। এই বিচ্ছেদ ঘটে দেহে। কিন্তু দেহধারী আত্মাতে কোনো সংযোগ বা বিচ্ছেদ নেই। এটি যেমন আছে তেমনই থাকে। এর মৃত্যু বলে কিছুই ঘটে না।
সকল পরিবর্তনের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু প্রধান। তাই প্রভু এদের দুইবার নিষেধ করেছেন: প্রথমে যা 'ন জায়তে' (জন্মগ্রহণ করে না) বলা হয়েছে, পরে আবার 'অজ:' (অজন্মা) বলা হয়েছে; এবং প্রথমে যা 'ন ম্রিয়তে' (মরে না) বলা হয়েছে, পরে আবার 'ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে' (দেহ নিহত হলেও নিহত হয় না) বলা হয়েছে।
'অয়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়:'—এই অবিনাশী, নিত্য তত্ত্ব একবার হয়ে গেলে আবার হয়ে যায় না; অর্থাৎ এটি স্বপ্রতিষ্ঠ ও অপরিবর্তনীয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি শিশু জন্মগ্রহণ করলে, তার অস্তিত্ব জন্মের পর আসে। মাতৃগর্ভে সঞ্চারিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ তার অস্তিত্বের (তার 'হওয়া'র) কথা বলে না। ইঙ্গিত হল যে শিশুর অস্তিত্ব তার জন্মের পরই ঘটে, কারণ সেই পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের একটি শুরু ও শেষ আছে। কিন্তু এই নিত্য তত্ত্বের অস্তিত্ব স্বপ্রতিষ্ঠ ও অপরিবর্তনীয়, কারণ এই অপরিবর্তনীয় অস্তিত্বের কোনো শুরু বা শেষ নেই।
'অজ:'—এই দেহধারী আত্মা কখনও জন্মগ্রহণ করে না। তাই একে 'অজ:' বলা হয়েছে—অর্থাৎ জন্মরহিত।
'নিত্যঃ'—এই দেহধারী আত্মা চিরন্তন ও চিরস্থায়ী; তাই এটি কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ক্ষয় ঘটে অনিত্য বস্তুতে, যা চিরস্থায়ী নয়। যেমন, আয়ুষ্কালের অর্ধেক পার হলে দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে, শক্তি ক্ষীণ হতে থাকে, ইন্দ্রিয়শক্তির হ্রাস ঘটে। এভাবে দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ইত্যাদি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, কিন্তু দেহধারী আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। এই নিত্য তত্ত্ব চিরকাল একরূপ, একসত্তা নিয়ে বিরাজ করে। এতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই, অর্থাৎ এটি কখনও পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তনের সামর্থ্যও এর নেই।
'পুরাণঃ'—এই অবিনাশী তত্ত্ব পুরাতন (পুরাণ), অর্থাৎ অনাদি। এটি এতই প্রাচীন যে এর কখনও জন্ম হয়নি। জন্মগ্রহণকারী বস্তুদের মধ্যেও দেখা যায়, একটি বস্তু পুরাতন হয়ে গেলে আর বৃদ্ধি পায় না; বরং তা বিনষ্ট হয়। কিন্তু এটি এক অ-জন্মা তত্ত্ব; এর মধ্যে বৃদ্ধির পরিবর্তন কীভাবে ঘটতে পারে? অর্থ হল, বৃদ্ধির পরিবর্তন কেবল জন্মগ্রহণকারী বস্তুতে ঘটে, এই নিত্য তত্ত্বে নয়।
'ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে'—দেহ ধ্বংস হলেও এই অবিনাশী দেহধারী আত্মা ধ্বংস হয় না। এখানে 'শরীরে' শব্দটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হল এই দেহটি নশ্বর—এটাই নির্দেশ করা। এই নশ্বর দেহেই ছয় প্রকার পরিবর্তন ঘটে, দেহধারী আত্মাতে নয়।
এই কথাগুলির মাধ্যমে প্রভু দেহ ও দেহধারী আত্মার এমন স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন—গীতার অন্যত্র যার নজির মেলে না।
অর্জুন যুদ্ধে আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুর আশঙ্কায় অত্যন্ত শোকাকুল ছিলেন। সেই শোক দূর করতে প্রভু বলেছেন যে দেহ মরলেও এই দেহধারী আত্মা মরে না, অর্থাৎ এর অস্তিত্ব লোপ পায় না। তাই শোক করা অনুচিত।
**সন্দর্ভ:** উনিশ শ্লোকে প্রভু বলেছেন যে এই দেহধারী আত্মা কাউকে বধও করে না, আবার বধ্যও হয় না। এই বিংশ শ্লোকে 'বধ্য হওয়া'র নিষেধ দেওয়া হয়েছে। এখন 'বধ করা'র কাজটির নিষেধ জানাতে পরবর্তী শ্লোক বলা হচ্ছে।
★🔗