**২.৫৩** শ্রুতিবিপ্রতিপত্তি দ্বারা চঞ্চল তোমার বুদ্ধি যখন স্থির ও অচল হইয়া পরমাত্মাতে নিবিষ্ট হইবে, তখনই তুমি যোগলাভ করিবে।
**ভাষ্য:** [সংসার আসক্তির কর্দম উত্তীর্ণ হইবার পরেও নানা শ্রুতিবিরোধজনিত মোহ থাকে। তাহা উত্তীর্ণ হইবার জন্য ভগবান্ এই শ্লোকে প্রেরণা দিতেছেন।]
'নানা শাস্ত্র শ্রবণে বিচলিত তোমার বুদ্ধি যখন... তখনই তুমি যোগলাভ করিবে'— অর্জুনের মনে এই শ্রুতিবিপ্রতিপত্তি আছে যে, গুরুজন ও কুলধ্বংস করা উচিত নহে, আবার ক্ষত্রিয়ধর্ম (যুদ্ধ) পরিত্যাগ করাও উচিত নহে। একদিকে কুলরক্ষা, অন্যদিকে ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন—কুলরক্ষা করিলে যুদ্ধ হইবে না, আর যুদ্ধ করিলে কুলরক্ষা হইবে না। এই দুই বিন্দুর বিরোধে অর্জুনের বুদ্ধি চঞ্চল হইয়াছে। (পাদটীকা পৃ. ৯১) তাই শ্রুতিবিরোধের মধ্যে বুদ্ধিকে স্থির (নিশ্চল) এবং পরমার্থলাভ বিষয়ে অচল করিবার জন্য ভগবান্ তাঁহাকে প্রেরণা দিতেছেন।
প্রথমে সাধকের এই সন্দেহ হয় যে, সংসার সংশোধন করিব, না পরমার্থ লাভ করিব? তারপর এই নিশ্চয় হয় যে, "সংসারের সেবাই করিব, কিন্তু সংসার হইতে কিছুই গ্রহণ করিব না।" এই নিশ্চয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাধকের ভোগে বৈরাগ্য ও বিতৃষ্ণা জন্মিতে থাকে। তারপর সাধক যখন পরমার্থের দিকে অগ্রসর হন, তখন সাধ্যম ও সাধন সম্বন্ধে নানা শ্রুতিবিরোধ তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হয়। "কোন্ সাধ্যম্ গ্রহণ করিব এবং কোন্ সাধনপদ্ধতিতে চলিব?"—ইহা স্থির করাই খুব দুরূহ হয়। কিন্তু সৎসঙ্গ দ্বারা সাধক যখন তাঁহার রুচি, শ্রদ্ধা-বিশ্বাস ও সামর্থ্য নির্ধারণ করেন, অথবা যখন নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়, তখন ভগবানের শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাকে ডাকেন...
সংসারের সহিত সম্বন্ধ ছেদ করিতে হইলে বুদ্ধিকে 'স্থির' (নিশ্চল) হইতে হইবে, যাহা ষষ্ঠ অধ্যায়ের ২৩ শ্লোকে 'দুঃখসংযোগবিয়োগং' বলিয়া উক্ত হইয়াছে। আর পরমাত্মার সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করিতে হইলে বুদ্ধিকে 'অচল' হইতে হইবে, যাহা দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৮ শ্লোকে 'সমত্বং যোগ উচ্যতে' বলিয়া কথিত হইয়াছে। এখানে 'তখনই তুমি যোগলাভ করিবে' এই বাক্যে যে যোগলাভের ইঙ্গিত আছে, তাহা এইরূপ নহে যে পূর্বে পরমাত্মার সহিত বিচ্ছেদ ছিল, সেই বিচ্ছেদ দূর করিয়া যোগলাভ হইল। বরং অসৎ বস্তুর সহিত ভ্রান্তিবশতঃ কল্পিত সম্বন্ধের সম্পূর্ণ ছেদের নামই যোগ। অর্থাৎ, মানুষের চিরন্তন সৎ অবস্থায় (পরমাত্মার সহিত নিত্য যোগে) অবস্থান করাই যোগ। সেই সৎ অবস্থা এমনই অলৌকিক যে, তাহা হইতে বিচ্ছেদ কখনও ঘটে না; ঘটিবারই সম্ভাবনা নাই। তাহাতে সংযোগ, বিচ্ছেদ বা মিলন প্রভৃতি কথার প্রয়োগ হয় না। এখানে কেবল অসতের সহিত মিথ্যা কল্পিত সম্বন্ধের পরিত্যাগকেই 'যোগ' আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। বস্তুতঃ এই যোগ নিত্যযোগকেই নির্দেশ করে। কর্ম (সেবা) দ্বারা এই নিত্যযোগের উপলব্ধি হইলে তাহার নাম 'কর্মযোগ'; বিবেক ও অনুসন্ধান দ্বারা হইলে 'জ্ঞানযোগ'; প্রেম দ্বারা হইলে 'ভক্তিযোগ'; বিশ্বলয়ে চিন্তা দ্বারা হইলে 'লয়যোগ'; প্রাণসংযম দ্বারা হইলে 'হঠযোগ'; এবং যম-নিয়মাদি অষ্টাঙ্গ দ্বারা হইলে 'অষ্টাঙ্গযোগ'।
**সন্দর্ভ:** মোহ ও শ্রুতিবিরোধের কর্দম দূর হইলে, অর্জুন স্থিতপ্রজ্ঞ যোগারূঢ় পুরুষের বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছেন।
★🔗