**২.৪০।** এই সমবুদ্ধি-ধর্মে প্রবৃত্তির কোনো ক্ষয় নেই এবং ইহার অনুষ্ঠানে কোনো বিপরীত ফল হয় না। ইহার অল্পমাত্র অনুষ্ঠানও মহাভয় (জন্ম-মৃত্যুরূপ) হইতে রক্ষা করে।
**ভাষ্য:** এই সমবুদ্ধির মহিমা প্রভু পূর্বার্ধের শেষাংশে ও এই (চত্বারিংশ) শ্লোকে চারিপ্রকারে ব্যাখ্যা করিয়াছেন – (১) ইহার দ্বারা কর্মবন্ধন হইতে মুক্তিলাভ হয়; (২) ইহার প্রবৃত্তি কখনও নষ্ট হয় না; (৩) ইহাতে কুফল হয় না; এবং (৪) ইহার অল্পানুষ্ঠানও মহাভয় হইতে রক্ষা করিতে সক্ষম।
'এখানে প্রবৃত্তির কোনো ক্ষয় নাই' – এই সমত্বের কেবলমাত্র প্রবৃত্তিই যদি হয়, সেই প্রবৃত্তিও কখনও নষ্ট হয় না। সমত্বলাভের জন্য মনে যে আকাঙ্ক্ষা, তীব্র বাসনা – ইহাই এই সমত্বের প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তি কখনও নষ্ট হয় না; কারণ সত্যের আকাঙ্ক্ষাই সত্য। 'এখানে' বলার তাৎপর্য এই যে, এই মনুষ্যলোকে কেবল মনুষ্যই এই সমবুদ্ধি লাভের অধিকারী। অন্যান্য ভোগলোক মনুষ্যলোক হইতে পৃথক। সেই সকল লোকে অসমত্ব (রাগ-দ্বেষ) নাশের সুযোগ নাই; কারণ রাগ ও দ্বেষ দ্বারাই ভোগ হয়। রাগ-দ্বেষ না থাকিলে ভোগই হয় না; বরং সাধনাই হয়।
'কোনো বিপরীত ফল হয় না' – কামনাপূর্বক অনুষ্ঠিত কর্মে মন্ত্রজপ, যজ্ঞাদি ক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকিলে বিপরীত ফল হয়। যেমন, কেহ পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করিলে এবং ক্রিয়ায় কোনো ভ্রম হইলে পুত্রলাভ তো দূরের কথা, গৃহে কাহারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটিতে পারে, কিংবা অল্প ত্রুটিতে এতদূর বিপরীত ফল না ঘটিলেও পুত্র সবল-সুস্থ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না! কিন্তু যে ব্যক্তি এই সমবুদ্ধিকে নিজের আচরণে আনিবার জন্য চেষ্টা করে, তাহার চেষ্টা, তাহার সাধনার কোনো বিপরীত ফল হয় না। কারণ তাহার সাধনায় ফলাকাঙ্ক্ষা নাই। ফলাকাঙ্ক্ষা যতদিন থাকে, সমত্ব হয় না, আর সমত্ব হইলে ফলাকাঙ্ক্ষা থাকে না। সুতরাং তাহার সাধনায় বিপরীত ফল হওয়া সম্ভবই নয়; সম্ভবই হয় না।
বিপরীত ফল কাহাকে বলে? জগতের সহিত অসমত্বই বিপরীত ফল। কোনো বিষয়ে আসক্তি এবং কোনো বিষয়ে বিরক্তি – ইহাই অসমত্ব, এবং এই অসমত্ব হইতেই জন্ম-মৃত্যুরূপ বন্ধন উৎপন্ন হয়। কিন্তু মানুষের যখন সমত্ব হয়, তখন রাগ-দ্বেষ থাকে না, এবং রাগ-দ্বেষ না থাকিলে অসমত্ব থাকে না। তখন বিপরীত ফল হইবার কোনো কারণই থাকে না।
'ইহার অল্পমাত্র ধর্মও মহাভয় হইতে রক্ষা করে' – এই সমবুদ্ধিধর্মের অল্পমাত্র অনুষ্ঠান যদি হয়, জীবন ও আচরণে অল্পমাত্র সমত্ব যদি প্রবেশ করে, তবে সে জন্ম-মৃত্যুর মহাভয় হইতে রক্ষা পায়। যেমন কামনাপূর্বক কর্ম ফলদান করিয়া নষ্ট হয়, এই সমত্ব ধন-সম্পদ প্রভৃতি কোনো ফল দিয়া নষ্ট হয় না; অর্থাৎ ইহার ফল বিনাশী ধনাদিলাভ নহে। সাধকের হৃদয়ে অনুকূল-প্রতিকূল বিষয়, ব্যক্তি, ঘটনা, পরিস্থিতি প্রভৃতির প্রতি যে পরিমাণ সমত্ব হয়, সেই পরিমাণ সমত্ব অক্ষয় হয়। এই সমত্ব কোনো কালেই বিনষ্ট হয় না। যেমন, সাধনাবস্থায় যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি যতটুকু সমত্ব লাভ করে, যতটুকু আধ্যাত্মিক সঞ্চয় করে, স্বর্গাদি উচ্চলোকে বহু বৎসর সুখভোগ করিয়া এবং মর্ত্যলোকে ধনীর গৃহে সুখভোগ করিয়াও (গীতা ৬.৪১-৪৪) তাহা নষ্ট হয় না। এই সমত্ব, এই আধ্যাত্মিক সঞ্চয় কিছুমাত্র ক্ষয় হয় না; বরং যেরূপ আছে সেইরূপই সঞ্চিত থাকে; কারণ ইহা সৎ, ইহা নিত্য।
'ধর্ম' শব্দ দ্বারা দুইটি বিষয় বুঝায় – (১) দান, জলাশয় নির্মাণ, অন্নসত্র প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি লোকহিতকর কর্ম সম্পাদন, এবং (২) শাস্ত্রবিহিত নিজ নিজ বর্ণাশ্রমোচিত কর্তব্য কর্ম নিষ্ঠার সহিত সম্পাদন। এই সকল ধর্ম নিষ্কামভাবে অনুষ্ঠান করিলে সমত্বরূপ ধর্ম স্বতঃই উৎপন্ন হয়; কারণ এই সমত্বধর্ম নিজের ধর্ম, অর্থাৎ স্বরূপ। এই প্রসঙ্গেই সমবুদ্ধিকে এখানে ধর্ম বলা হইয়াছে।
**সমত্ব বিষয়ে একটি বিশেষ কথা:**
সাধারণত মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে, মন একাগ্র না হইলে ভজন-স্মরণ হয় না; মন একাগ্র না হইলে 'রাম-রাম' জপ করিলে কি ফল? কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে মন একাগ্র হওয়া খুব বড় জিনিস নয়। গীতার দৃষ্টিতে বড় জিনিস – সমত্ব। অন্যান্য লক্ষণ প্রকাশ পাক বা না পাক, যাহার সমত্ব হইয়াছে, গীতা তাহাকেই সিদ্ধ বলিয়াছেন। যাহার অন্যান্য সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পায় কিন্তু সমত্ব হয় না, গীতা তাহাকে সিদ্ধ বলেন নাই।
সমত্ব দুই প্রকার – অন্তঃকরণের সমত্ব এবং স্বরূপের সমত্ব। সমত্বপরমাত্মা সর্বত্র পূর্ণরূপে বিদ্যমান। সেই সমত্বপরমাত্মাতে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি সমস্ত জগৎ জয় করিয়াছেন; তিনি জীবন্মুক্ত হইয়াছেন। কিন্তু তাহার প্রত্যয় হয় অন্তঃকরণের সমত্ব দ্বারা (গীতা ৫.১৯)। অন্তঃকরণের সমত্ব – সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে সমবুদ্ধি (গীতা ২.৪৮)। প্রশংসা হউক বা নিন্দা হউক, চেষ্টা সফল হউক বা বিফল হউক, লক্ষ লক্ষ টাকা আসুক বা লক্ষ লক্ষ টাকা চলে যাক, তবু তাহাতে অন্তঃকরণে কোনো চাঞ্চল্য হয় না; সুখ-দুঃখ, হর্ষ-বিষাদ প্রভৃতি হয় না (গীতা ৫.২০)। এই সমত্ব কখনও বিনষ্ট হয় না। মঙ্গল ভিন্ন এই সমত্বের অন্য কোনো ফল হয় না।
মানুষ তপস্যা, দান, তীর্থ, ব্রত প্রভৃতি যেকোনো পুণ্যকর্ম করিতে পারে; তাহারা ফলদান করিয়া নষ্ট হয়। কিন্তু সাধন করিতে করিতে অন্তঃকরণে অল্পমাত্র সমত্ব (বিকারের অভাব) হইলেও তাহা নষ্ট হয় না; বরং মঙ্গলই দান করে। তাই সাধনায় সমত্ব এমন উচ্চ বস্তু, যেমন মনঃসংযম নয়। মন একাগ্র হইলে সিদ্ধিলাভ হইতে পারে, কিন্তু মঙ্গললাভ হয় না। কিন্তু সমত্ব উপস্থিত হইলে মানুষ সুখে সংসারবন্ধন হইতে মুক্ত হয় (গীতা ৫.৩)।
**সন্দর্ভ:** উনচল্লিশ শ্লোকে প্রভু যোগপ্রসঙ্গে সেই সমবুদ্ধি শ্রবণের কথা বলিয়াছেন। সেই সমবুদ্ধি লাভের উপায় পরবর্তী শ্লোকসমূহে ব্যাখ্যা করিতেছেন।
★🔗