২.১৩: দেহী এই দেহে যেমন বাল্য, যৌবন ও বাৰ্ধক্য প্রাপ্ত হয়, তেমনি অন্য দেহলাভও হয়। এতে জ্ঞানী ব্যক্তি মোহিত হন না।
ভাষ্য: ব্যাখ্যা— ‘দেহী এই দেহে যেমন বাল্য, যৌবন ও বাৰ্ধক্য প্রাপ্ত হয়…’ প্রথমে দেহী এই দেহে বাল্য প্রাপ্ত হয়, তারপর যৌবন, তারপর বাৰ্ধক্য। অর্থাৎ দেহে এক অবস্থা কখনো স্থির থাকে না; দেহের মধ্যে নিরন্তর পরিবর্তন চলছে।
এখানে ‘দেহী এই দেহে’ বলতে দেহ ও দেহী পৃথক— এটা প্রতিষ্ঠিত হল। দেহী দ্রষ্টা, দেহ দৃশ্য। তাই দেহে বাল্যাদি অবস্থার পরিবর্তন যা হয়, দেহীতে তা হয় না।
‘তেমনি অন্য দেহলাভও হয়’— যেমন দেহের বাল্য, যৌবনাদি অবস্থা হয়, তেমনি অন্য দেহলাভও হয়, অর্থাৎ অন্য দেহ প্রাপ্তি হয়। যেমন স্থূলদেহ বালক থেকে যুবক, যুবক থেকে বৃদ্ধ হয়, এই অবস্থা-পরিবর্তনে কোন শোক করা হয় না। তেমনি দেহী এক দেহ থেকে অন্য দেহে গেলেও এতে শোক করা উচিত নয়। যেমন বাল্য, যৌবনাদি অবস্থা স্থূলদেহ থাকতে হয়, তেমনি অন্য দেহলাভ সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ থাকতে হয়। অর্থাৎ বাল্য, যৌবন যেমন স্থূলদেহের অবস্থা, তেমনি অন্য দেহলাভ (মৃত্যুর পর অন্য দেহ ধারণ) সূক্ষ্ম ও কারণ দেহের অবস্থা।
বাল্যাদি অবস্থার পরিবর্তন স্থূলদেহ থাকতে হয়— এটা স্থূল দৃষ্টি। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবস্থার মতো স্থূলদেহও নিরন্তর পরিবর্তনশীল। বাল্যে যে দেহ ছিল, যৌবনে তা থাকে না। বাস্তবে এক ক্ষণের জন্যও স্থূলদেহের পরিবর্তন হয় না, এমন নয়। তেমনি সূক্ষ্ম ও কারণ দেহেরও নিরন্তর ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়, যা অন্য দেহলাভ রূপে স্পষ্ট প্রকাশ পায়।
এখন বিচার এই— আমাদের স্থূলদেহের জ্ঞান আছে, কিন্তু সূক্ষ্ম ও কারণ দেহের জ্ঞান নেই। তাই সূক্ষ্ম ও কারণ দেহের জ্ঞানই যখন নেই, তখন তাদের পরিবর্তনের জ্ঞান কীভাবে হবে? উত্তর— যেমন স্থূলদেহের অবস্থা বিবেচনা করে তার জ্ঞান হয়, তেমনি সূক্ষ্ম ও কারণ দেহের অবস্থা বিবেচনা করেও তাদের জ্ঞান হয়। স্থূলদেহ ‘জাগ্রৎ’ অবস্থা, সূক্ষ্মদেহ ‘স্বপ্ন’ অবস্থা, কারণ দেহ ‘সুষুপ্তি’ অবস্থা বলে বিবেচিত। ব্যক্তি বাল্যে বালকরূপে, যৌবনে যুবকরূপে, বাৰ্ধক্যে বৃদ্ধরূপে স্বপ্নে নিজেকে দেখে। এতে প্রমাণ হয় যে, স্থূলদেহের সঙ্গে সূক্ষ্মদেহও পরিবর্তিত হয়। তেমনি সুষুপ্তি অবস্থা বাল্যে বেশি, যৌবনে কম, বাৰ্ধক্যে খুবই কম হয়; এতে কারণ দেহেরও পরিবর্তন প্রমাণ হয়। আরেকটি কথা— বাল্যে ও যৌবনে শুয়ে যে দেহ-ইন্দ্রিয়ের সতেজতা আসে, বাৰ্ধক্যে শুয়ে তা আসে না, অর্থাৎ বাৰ্ধক্যে বাল্য-যৌবনের মতো বিশ্রাম পাওয়া যায় না। এভাবেও কারণ দেহের পরিবর্তন প্রমাণ হয়।
যে অন্য দেবতা, পশু, পক্ষী ইত্যাদির দেহ প্রাপ্ত হয়, সে সেই দেহে (দেহাভিমানে) ‘আমি এই’— এইরূপ অনুভব করে, এটা সূক্ষ্মদেহের পরিবর্তন। তেমনি কারণ দেহে প্রকৃতি থাকে, যা স্থূল দৃষ্টিতে অভ্যাস বলা হয়। সেই অভ্যাস দেবতার অন্যরকম, পশু-পক্ষীর অন্যরকম— এটা কারণ দেহের পরিবর্তন।
দেহী (দেহধারী আত্মা) যদি পরিবর্তনশীল হত, তাহলে অবস্থা পরিবর্তন হলেও ‘আমি সেইই আছি’— এই জ্ঞান হত না। কিন্তু অবস্থা পরিবর্তন হলেও জ্ঞান হয়— ‘আমি সেইই, যিনি পূর্বে বালক ছিলেন, যিনি পূর্বে যুবক ছিলেন।’ এতে প্রমাণ হয় যে, দেহীতে অর্থাৎ আত্মাতে কোন পরিবর্তন হয়নি।
এখানে সন্দেহ হতে পারে— আমরা স্থূলদেহের অবস্থা-পরিবর্তনের জ্ঞান রাখি, কিন্তু অন্য দেহলাভ হলে পূর্বদেহের জ্ঞান থাকে না কেন? পূর্বদেহের জ্ঞান না থাকার কারণ— মৃত্যু ও জন্মকালে মহা কষ্ট হয়। সেই কষ্টের জন্য পূর্বজন্মের স্মৃতি বুদ্ধিতে থাকে না। যেমন পক্ষাঘাত বা অতি বাৰ্ধক্যে বুদ্ধি পূর্বের মতো জ্ঞান ধরে রাখতে পারে না, তেমনি মৃত্যু ও জন্মকালে মহা আঘাতের জন্য পূর্বজন্মের জ্ঞান থাকে না। কিন্তু যার মৃত্যুতে এমন কষ্ট হয় না, অর্থাৎ যার অন্য দেহলাভ দেহের অন্য অবস্থা প্রাপ্তির মতোই সহজে হয়, তার বুদ্ধিতে পূর্বজন্মের স্মৃতি থাকতেও পারে।
এখন মনে করো— অন্য অবস্থা প্রাপ্তিতে যে ধরনের জ্ঞান হয়, অন্য দেহলাভে তা হয় না; কিন্তু ‘আমি আছি’— নিজের অস্তিত্বের জ্ঞান সবার থাকে। যেমন সুষুপ্তিতে কোন কিছুর জ্ঞান থাকে না, কিন্তু জাগরণে ব্যক্তি বলে— ‘এমন গভীর নিদ্রা এল যে, আমার কিছুই জানা ছিল না’— তাই ‘আমি অজ্ঞান ছিলাম’ এই জ্ঞান অবশ্যই আছে। আমি যে নিদ্রার পূর্বে ছিলাম, সেই আমি জাগরণের পরও আছি, তাই সুষুপ্তিতেও সেই আমি ছিলাম— এভাবে নিজের অস্তিত্বের জ্ঞান নিরবচ্ছিন্নভাবে অবিচ্ছিন্ন রূপে থাকে। নিজের অস্তিত্ব না থাকার জ্ঞান কখনো কারো হয় না। দেহীর অস্তিত্ব অবিচ্ছিন্ন রূপে থাকে; তবেই মুক্তি সম্ভব, এবং মুক্ত অবস্থায়ও তা থাকে। বস্তুত জীবন্মুক্ত অবস্থায় অন্য দেহের জ্ঞান না থাকলেও ‘আমি তিন দেহ থেকে পৃথক’— এই অনুভূতি অবশ্যই হয়।
‘এতে জ্ঞানী ব্যক্তি মোহিত হন না’— জ্ঞানী কেবল সেই, যিনি সত্য-মিথ্যা বিবেচনা করেছেন। এমন জ্ঞানী সেই বিষয়ে কখনো মোহিত হন না; তাঁর কখনো সন্দেহ হয় না। এর অর্থ এই নয় যে, এমন জ্ঞানী অন্য দেহলাভ করেন। উচ্চ-নীচ যোনিতে জন্ম গুণসংসর্গের ফলে হয়, এবং গুণসংসর্গ ছিন্ন হলে জ্ঞানীর অন্য দেহলাভ কখনো সম্ভব নয়।
এখানে ‘এতে’ শব্দের অর্থ ‘অন্য দেহলাভ বিষয়ে’ নয়, বরং ‘দেহ ও দেহী বিষয়ে’। অর্থাৎ— দেহ কী? দেহী কী? পরিবর্তনশীল কী? অপরিবর্তনীয় কী? অনিত্য কী? নিত্য কী? মিথ্যা কী? সত্য কী? বিকারী কী? এই বিষয়ে তিনি মোহিত হন না। দেহ ও দেহী সম্পূর্ণ পৃথক— এই বিষয়ে তিনি কখনো মোহিত হন না। তাঁর নিজের আসক্তিহীন স্বরূপের জ্ঞান নিরবচ্ছিন্ন।
সূত্র: শরীর ইত্যাদি অনিত্য বস্তুতে আসক্তি থেকে যে শোক জন্মায়, তা দূর করতেই এটা বলা হয়েছে।
★🔗