২.৬৭. কারণ, মন যখন কোনো একটি চঞ্চল ইন্দ্রিয়ের অনুগামী হয়, তখন সেই মন বাতাসের মতো ব্যক্তির বুদ্ধিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যেমন জলরাশি নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
**ব্যাখ্যা:** এই মানবজন্ম একমাত্র ঈশ্বরলাভের জন্যই লাভ হয়েছে। তাই দৃঢ় সংকল্প হওয়া উচিত— "যে-কোনো মূল্যে আমাকে ঈশ্বরকেই লাভ করতে হবে।" লক্ষ্য যখন দৃঢ় হয়, তখন সাধকের অহংকার থেকে ভোগের গুরুত্ব লোপ পায়। সেই গুরুত্ব লোপ পেলে দৃঢ়নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি স্থির হয়। কিন্তু যে পর্যন্ত না সেই দৃঢ়নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি স্থির হয়, তার অবস্থাই কি— তা এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে।
যখন সাধক কর্মক্ষেত্রে প্রবৃত্ত হন, তখন ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো তাঁর সম্মুখে আসবেই। তার মধ্যে যে ইন্দ্রিয়টি যে বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়, সেই ইন্দ্রিয়ই মনকে নিজের অনুগামী করে, মনকে টেনে নিয়ে চলে। ফলে মন সেই বিষয়ের সুখভোগ করতে থাকে, অর্থাৎ মনের মধ্যে সুখবোধ, ভোগের ইচ্ছা জাগে; মন সেই বিষয়ে রঞ্জিত হয়, তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন— ভোজন করার সময় কোনো বিশেষ রসের আস্বাদন হলে রসনেন্দ্রিয় তার প্রতি আসক্ত হয়। আসক্ত হয়ে রসনেন্দ্রিয় মনকে টেনে নেয় এবং মন সেই রসে প্রীত ও উল্লসিত হয়।
মনে যখন কোনো বিষয়ের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই মনই সাধকের বুদ্ধিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অর্থাৎ কর্তব্যচেতনার পরিবর্তে সাধকের মধ্যে ভোগেচ্ছার সৃষ্টি হয়। এই ভোগেচ্ছার কারণে "আমাকে একমাত্র ঈশ্বরকেই লাভ করতে হবে"— এই দৃঢ়নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি সাধকের মধ্যে থাকে না। এটা বিশ্লেষণ করতে সময় লাগলেও বুদ্ধি তৎক্ষণাৎ বিচলিত হয়; অর্থাৎ যে মুহূর্তে কোনো ইন্দ্রিয় মনকে নিজের অনুগামী করে, সেই মুহূর্তেই মনের মধ্যে ভোগেচ্ছার সৃষ্টি হয় এবং সেই মুহূর্তেই বুদ্ধি পরাভূত হয়।
কীভাবে সেই বুদ্ধি ভেসে যায়— তার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা হয়েছে: যেমন বাতাস জলরাশির উপর নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনই মন বুদ্ধিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যেমন— কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নৌকা করে নদী বা সমুদ্র পার হচ্ছেন। সেই সময় যদি প্রতিকূল বাতাস বয়, তবে সেই বাতাস নৌকাকে গন্তব্য থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তেমনই একজন সাধক দৃঢ়নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির নৌকায় চড়ে সংসারসাগর পার হয়ে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তখন একটি মাত্র ইন্দ্রিয় যা মনকে নিজের অনুগামী করে, সেই মনই বুদ্ধির নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অর্থাৎ সংসারের দিকে নিয়ে চলে। ফলে সাধকের মধ্যে বিষয়ে সুখবোধ ও সংসারের উপকারী বস্তুতে গুরুত্ববোধ জন্মায়।
বাতাস নৌকাকে দুইভাবে ব্যতিব্যস্ত করে: নৌকাকে পথভ্রষ্ট করে অথবা জলে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু যদি নিপুণ কর্ণধার থাকে, তবে সে বাতাসের ক্রিয়াকে অনুকূল করে, ফলে বাতাস নৌকাকে পথচ্যুত করতে পারে না; বরং গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তেমনই ইন্দ্রিয়ের অনুগামী হয়ে মন বুদ্ধিকে দুইভাবে ব্যতিব্যস্ত করে: ভোগেচ্ছা উৎপাদন করে ঈশ্বরলাভের দৃঢ় সংকল্পকে দমিত করে, অথবা নিষিদ্ধ ভোগে প্রবৃত্ত করে পতন ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু যার মন ও ইন্দ্রিয়গুলি বশীভূত, তার মন বুদ্ধিকে ব্যতিব্যস্ত করে না; বরং ঈশ্বরপ্রাপ্তিতে সাহায্য করে (২.৬৪-৬৫)।
**সন্দর্ভ:** অশিক্ষিত ব্যক্তির দৃঢ়নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি না থাকার কারণ পূর্বশ্লোকে বলা হয়েছে। এখন শিক্ষিত ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করতে পরবর্তী শ্লোক বলা হচ্ছে।
★🔗