**২.২৩** এই আত্মাকে শস্ত্র কাটিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না, জল আর্দ্র করিতে পারে না, বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না।
**ভাষ্য:** "শস্ত্র কাটিতে পারে না" – শস্ত্র এই আত্মাকে কাটিতে পারে না, কারণ এই পার্থিব শস্ত্র ইহার নিকটে পৌঁছতেই পারে না। সকল শস্ত্রই পৃথিবী-তত্ত্ব হইতে উৎপন্ন। এই পৃথিবী-তত্ত্ব এই আত্মাতে কোন প্রকার বিকৃতি উৎপাদন করিতে পারে না। তাহা নহে, এই পৃথিবী-তত্ত্ব এই আত্মার নিকটে পৌঁছতেই পারে না, বিকৃতি উৎপাদন তো দূরের কথা।
"অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না" – অগ্নি এই আত্মাকে দগ্ধ করিতে পারে না, কারণ অগ্নি ইহার নিকটে পৌঁছতে পারে না। যখন নিকটে পৌঁছতেই পারে না, তখন তাহার দ্বারা দগ্ধ হওয়া কিরূপে সম্ভব? অর্থাৎ অগ্নি-তত্ত্ব এই আত্মাতে কোন প্রকার বিকৃতি কখনও উৎপাদন করিতে পারে না।
"জল আর্দ্র করিতে পারে না" – জল ইহাকে আর্দ্র করিতে পারে না, কারণ জল ইহার নিকটে পৌঁছতে পারে না। অর্থাৎ জল-তত্ত্ব এই আত্মাতে কোন প্রকার বিকৃতি উৎপাদন করিতে পারে না।
"বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না" – বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না, অর্থাৎ বায়ুর এই আত্মাকে শুষ্ক করিবার শক্তি নাই, কারণ বায়ু ইহার নিকটে পৌঁছতে পারে না। অর্থাৎ বায়ু-তত্ত্ব এই আত্মাতে কোন প্রকার বিকৃতি উৎপাদন করিতে পারে না।
পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ – ইহাদিগকে পঞ্চমহাভূত বলে। প্রভু এই মহাভূতগুলির মধ্যে কেবল চারিটিরই উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, পৃথিবী, জল, অগ্নি ও বায়ু এই আত্মাতে কোন প্রকার বিকৃতি উৎপাদন করিতে পারে না; কিন্তু পঞ্চম মহাভূত আকাশের আলোচনা করেন নাই। ইহার কারণ এই যে, আকাশের কোন ক্রিয়া করিবার শক্তি নাই। কেবল এই চারিটি মহাভূতেরই ক্রিয়া করিবার (বিকৃতি উৎপাদনের) শক্তি আছে। আকাশ কেবল ইহাদের সকলেরই স্থান দান করে মাত্র।
পৃথিবী, জল, অগ্নি ও বায়ু – এই চারিটি ভূতই আকাশ হইতেই উৎপন্ন, অথচ ইহারা ইহাদের কারণ আকাশের মধ্যেও কোন প্রকার বিকৃতি উৎপাদন করিতে পারে না। অর্থাৎ পৃথিবী আকাশকে বিদ্ধ করিতে পারে না, জল ইহাকে আর্দ্র করিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না এবং বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না। যখন এই চারিটি ভূত ইহাদের কারণ আকাশের, মহৎ-তত্ত্বের (জগতের কারণ বুদ্ধির, যাহা আকাশের কারণ) অথবা প্রকৃতির (যাহা মহৎ-তত্ত্বের কারণ) কোন ক্ষতি করিতে পারে না, তখন ইহারা প্রকৃতির সম্পূর্ণ অতীত সেই আত্মার নিকটে কিরূপে পৌঁছিবে? এই গুণযুক্ত পদার্থগুলি সেই নির্গুণ তত্ত্বের নিকটে কিরূপে পৌঁছিবে? ইহা অসম্ভব (গীতা ১৩.৩১)।
আত্মা নিত্য তত্ত্ব। চারিটি ভূত – পৃথিবী প্রভৃতি – ইহার দ্বারাই স্বীয় অস্তিত্ব ও চৈতন্য লাভ করে। অতএব, যাহারা ইহার নিকট হইতে অস্তিত্ব ও চৈতন্য লাভ করে, তাহারা ইহাকে কিরূপে বিকৃত করিবে? এই আত্মা সর্বব্যাপী, এবং চারিটি ভূত – পৃথিবী প্রভৃতি – ব্যাপ্য, অর্থাৎ আত্মার অন্তর্গত। অতএব, ব্যাপ্য বস্তু সর্বব্যাপীকে কিরূপে ক্ষতি করিবে? ইহাকে ক্ষতি করাই একেবারে অসম্ভব।
এখানে প্রসঙ্গটি যুদ্ধের। অর্জুন শোক করিতেছেন, মনে করিতেছেন, "এই সকল আত্মীয়েরা মরিবে।" তাই প্রভু বলিতেছেন, "ইহারা কিরূপে মরিবে? কারণ, শস্ত্রের ক্রিয়া সেই (আত্মার) নিকটে পৌঁছিতে পারে না।" অর্থাৎ, শরীর শস্ত্র দ্বারা কাটা গেলেও আত্মা কাটা যায় না; শরীর অগ্নি-শস্ত্র দ্বারা দগ্ধ হইলেও আত্মা দগ্ধ হয় না; শরীর জল-শস্ত্র দ্বারা বিগলিত হইলেও আত্মা বিগলিত হয় না; এবং শরীর বায়ু-শস্ত্র দ্বারা শুষ্ক হইলেও আত্মা শুষ্ক হয় না। অর্থাৎ, শরীর শস্ত্র দ্বারা মরিলেও আত্মা মরে না; বরং অবিকৃত অবস্থায় ঠিক যেমন আছে, তেমনই থাকে। অতএব, ইহার জন্য শোক করা তোমার পক্ষে একান্তই মূর্খতা।
★🔗