**২.৫৪।** অর্জুন বললেন — হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের লক্ষণই বা কি? সমাধিস্থ পুরুষ কেমন করে কথা বলেন, কেমন করে বসেন, আর কেমন করে চলেন?
**ভাষ্য:** ২.৫৪। **ব্যাখ্যা** — এখানে অর্জুন স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ সম্বন্ধে যে প্রশ্ন করলেন, তা তাঁর মনে কর্ম ও জ্ঞানের বিষয়ে প্রথমে যে সন্দেহের উদয় হয়েছিল (শ্লোক ২.৪৭-৫০), তা থেকেই উত্থিত। কিন্তু প্রভু ৫২-৫৩ শ্লোকে বলার পর যে, যখন তাঁর বুদ্ধি মোহের কর্দম ও পরস্পরবিরোধী শাস্ত্রবিধিজনিত সংশয় অতিক্রম করবে, তখন তিনি যোগলাভ করবেন, তখন অর্জুন ভাবলেন — "যখন আমি যোগলাভ করে স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ হব, তখন আমার লক্ষণই বা কি হবে?" তাই অর্জুন প্রথমে তাঁর এই ব্যক্তিগত সন্দেহটি জিজ্ঞাসা করলেন। কর্ম ও জ্ঞান সংক্রান্ত অপর সন্দেহটি, অর্থাৎ তত্ত্ব সম্বন্ধীয় সন্দেহ, স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের লক্ষণ বর্ণনার পর (৩.১২ শ্লোকে) পরে জিজ্ঞাসা করলেন। অর্জুন যদি এখানে ৫৪ শ্লোকেই তত্ত্ব সম্বন্ধীয় প্রশ্ন করতেন, তাহলে স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসার সুযোগ বহুদূরে সরে যেত।
'সমাধিস্থ' — এখানে 'সমাধিস্থ' শব্দটি পরমাত্মপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বোঝায়।
'স্থিতপ্রজ্ঞ' — এই পদটি সাধক ও সিদ্ধ উভয়কেই নির্দেশ করে। যার সংকল্প দৃঢ়, যে সাধনা থেকে কখনও বিচলিত হয় না, সেই সাধকও স্থিতপ্রজ্ঞ। আর যে সিদ্ধ ব্যক্তির বুদ্ধি পরমতত্ত্বের প্রত্যক্ষানুভূতির দ্বারা স্থির হয়ে গেছে, সেও স্থিতপ্রজ্ঞ। তাই এখানে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' পদটি সাধক ও সিদ্ধ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। পূর্বে ৪১ থেকে ৪৫ এবং ৪৭ থেকে ৫৩ শ্লোক পর্যন্ত বর্ণনা সাধকদের বিষয়ে ছিল; তাই পরের শ্লোকগুলিতে সিদ্ধ পুরুষের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে সাধককেও বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে একটি সন্দেহ উঠতে পারে: অর্জুন 'সমাধিস্থ' শব্দ ব্যবহার করে বিশেষভাবে সিদ্ধ স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষেরই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, তবে প্রভু স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে সাধক-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কেন অন্তর্ভুক্ত করলেন? এর সমাধান এই: জ্ঞানযোগীর পক্ষে সাধনাবস্থাতেই সাধারণত কর্ম থেকে বৈরাগ্য ঘটে। সিদ্ধাবস্থায় তিনি কর্ম থেকে বিশেষভাবে নিবৃত্ত হন।
ভক্তিযোগীর পক্ষে সাধনাবস্থাতেই ভগবদ্কর্মে — নামজপ, ধ্যান, সৎসঙ্গ, স্বাধ্যায় ইত্যাদিতে — আসক্তি ও আধিক্য থাকে। সিদ্ধাবস্থায় ভগবদ্কর্ম বিশেষ তীব্রতায় অনুষ্ঠিত হয়। এইভাবে জ্ঞানযোগী ও ভক্তিযোগী উভয়েরই সাধনাবস্থা ও সিদ্ধাবস্থার মধ্যে পার্থক্য ঘটে। কিন্তু কর্মযোগীর পক্ষে সাধনাবস্থা ও সিদ্ধাবস্থার মধ্যে এমন কোন পার্থক্য নেই। কর্মানুষ্ঠানের ধারা উভয় অবস্থাতেই অপরিবর্তিত থাকে। কারণ, সাধনাবস্থায় তাঁর কর্মানুষ্ঠানের ধারা ছিল, আর যোগে প্রতিষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রেও কর্মই ছিল মুখ্য হেতু। তাই সিদ্ধ পুরুষের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে প্রভু সেই সাধনাগুলিও উল্লেখ করেছেন, যার দ্বারা সাধক সিদ্ধ হতে পারেন, এবং যারা সিদ্ধ হয়েছেন তাদের লক্ষণও বলেছেন।
'কিং ভাষেত' — পরমাত্মায় প্রতিষ্ঠিত স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ কোন্ শব্দে বর্ণিত হন? অর্থাৎ তাঁর লক্ষণই বা কি? (এর উত্তর প্রভু পরবর্তী শ্লোকে দিয়েছেন।)
'কথং কুর্যাত' — সেই স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ কেমন করে কথা বলেন? (এর উত্তর প্রভু ৫৬-৬৯ শ্লোকে দিয়েছেন।)
'কথং আসীত' — তিনি কেমন করে বসেন? অর্থাৎ জগৎ থেকে কেমন করে নিবৃত্ত হন? (এর উত্তর প্রভু ৫৮ থেকে ৬৩ শ্লোক পর্যন্ত দিয়েছেন।)
- 'কথং প্রযযাত' — তিনি কেমন করে চলেন? অর্থাৎ তাঁর আচরণ কেমন? (এর উত্তর প্রভু ৬৪ থেকে ৭১ শ্লোক পর্যন্ত দিয়েছেন।)
**সংযোগ** — এখন, পরবর্তী শ্লোকে প্রভু অর্জুনের প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।
★🔗