**শ্রীভগবান বললেন (ভাষ্য পৃ. ৩৮.১) –** হে অর্জুন! এই সঙ্কটকালে তোমার এত দুর্বলতা কোথা থেকে এল? এটা আর্যদের (শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের) অনুমোদিত নয়, স্বর্গলাভের পথও নয়, এবং যশদায়কও নয়।
**ভাষ্য:**
**২.২। ব্যাখ্যা –** 'অর্জুন' – এই নামে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য হল, তিনি যিনি নির্মল, কলুষহীন অন্তঃকরণের অধিকারী। তাই তাঁর স্বভাবেই এই কলুষ—দুর্বলতা—এর উদ্ভব একেবারে বিরুদ্ধ। তাহলে এটা তাঁর মধ্যে এল কীভাবে?
'কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্' – বিস্ময় প্রকাশ করে প্রভু অর্জুনকে বলছেন যে, যুদ্ধের এমন সময়ে তোমার মধ্যে তো বীরত্ব ও উদ্দীপনা জেগে উঠার কথা ছিল, কিন্তু এই অসময়ে এ দুর্বলতা তোমায় কোথা থেকে এসে আবৃত করল!
বিস্ময় দুই প্রকার হয়—নিজের অজ্ঞতাবশত, এবং অপরকে জাগ্রত করার জন্য। এখানে প্রভুর বিস্ময়সূচক উক্তি সম্পূর্ণরূপে অর্জুনকে জাগ্রত করার জন্য, যাতে অর্জুনের মন তাঁর কর্তব্যের দিকে ফিরে আসে। 'কুতঃ' (কোথা থেকে) বলার তাৎপর্য হল, মৌলিকভাবে, দুর্বলতারূপে এই দোষ তোমাতে (তোমার আত্মস্বরূপে) নেই। এটা একটি আগন্তুক দোষ, স্থায়ী নয়।
'সমুপস্থিতম্' (সমাগত/আবৃত করেছে) বলার তাৎপর্য হল, এই দুর্বলতা কেবল তোমার চিন্তায় ও বাক্যে উদ্ভূত হয়নি; বরং তা তোমার কর্মেও প্রবেশ করেছে। এটা তোমাকে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন করেছে, যার কারণে তুমি তোমার ধনু-শর রেখে রথের মাঝখানে বসে পড়েছ।
'অনার্য্যজুষ্টম্' (ভাষ্য পৃ. ৩৮.২) – জ্ঞানী, মহান ব্যক্তিদের মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়, তা কেবল তাদের নিজের মঙ্গলের জন্যই হয়। তাই শ্লোকের পরার্ধে প্রভু প্রথমে উপরের শব্দটি ব্যবহার করে বলছেন যে, তোমার মধ্যে উদ্ভূত এই দুর্বলতা আর্যদের (শ্রেষ্ঠজনদের) দ্বারা গৃহীত নয়। কারণ হল, তোমার এই দুর্বলতায় তোমার নিজের মঙ্গলের কথা একেবারেই বিবেচনা করা হয়নি। মঙ্গলকামী আর্যগণ তাদের মঙ্গলকেই লক্ষ্য রেখে কর্মে ও ত্যাগে ব্রতী হন। তাদের মধ্যে তাদের কর্তব্যে দুর্বলতা আসে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী যে কর্তব্যই তাদের সামনে উপস্থিত হয়, তারা মঙ্গললাভের উদ্দেশ্যে তা সম্পূর্ণরূপে, উৎসাহ ও যত্ন সহকারে সম্পাদন করেন। তোমার মতো দুর্বল হয়ে তারা যুদ্ধ বা অন্য কোনো অবশ্যকর্তব্য থেকে বিরত হন না। তাই, যুদ্ধরূপে উপস্থিত কর্তব্য থেকে বিরত হওয়া তোমার মঙ্গলের পথ নয়।
'অস্বর্গ্যম্' – মঙ্গলের কথা যদি না-ও ভাবা হয় এবং কেবল বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলেও স্বর্গই জগতে পরম প্রাপ্তি বলে গণ্য। কিন্তু তোমার এই দুর্বলতা স্বর্গের দিকেও নিয়ে যায় না, অর্থাৎ দুর্বলতাবশত যুদ্ধ থেকে বিরত হওয়ার ফল স্বর্গলাভ হতে পারে না।
'অকীর্তিকরম্' – স্বর্গলাভ যদি লক্ষ্যই না হয়, তাহলেও একজন সৎ বলে গণ্য ব্যক্তি কেবল সেই কাজই করেন যা জগতে যশ বয়ে আনে। কিন্তু তোমার এই দুর্বলতা এই জগতে যশ (খ্যাতি) দান করে না; বরং অযশই বয়ে আনে। তাই, তোমার মধ্যে দুর্বলতার উদ্ভব একেবারেই অনুচিত।
এখানে, 'অনার্য্যজুষ্টম্', 'অস্বর্গ্যম্' এবং 'অকীর্তিকরম্' এই ক্রমটি দিয়ে প্রভু তিন প্রকার মানুষকে নির্দেশ করেছেন: (১) যারা চিন্তাশীল পুরুষ, তারা কেবল নিজের মঙ্গলই কামনা করেন। তাদের লক্ষ্য, তাদের উদ্দেশ্য কেবল মঙ্গল। (২) যারা ধর্মপরায়ণ পুরুষ, তারা ধর্মকর্ম দ্বারা স্বর্গলাভ কামনা করেন। তারা স্বর্গকেই পরম মনে করেন এবং তার প্রাপ্তিকেই উদ্দেশ্য রাখেন। (৩) যারা সাধারণ মানুষ, তারা কেবল লোকসমাজকেই সম্মান করেন। তাই তারা জগতে নিজের যশ কামনা করেন এবং সেই যশকেই নিজের লক্ষ্য মনে করেন।
উপরের তিনটি শব্দ দিয়ে প্রভু অর্জুনকে সতর্ক করছেন যে, যুদ্ধ না করার তোমার এই সংকল্প চিন্তাশীল ও ধর্মপরায়ণ পুরুষদের লক্ষ্য—মঙ্গল ও স্বর্গ—লাভের অনুকূল নয়, এমনকি সাধারণ মানুষের লক্ষ্য—যশ—লাভেরও অনুকূল নয়। তাই, মোহবশত তোমার যুদ্ধ না করার সংকল্প অতি নীচ, যা তোমার পতন ঘটাবে, নরকে নিয়ে যাবে এবং অযশ বয়ে আনবে।
**সন্দর্ভ –** দুর্বলতা উদ্ভূত হওয়ার পর এখন কী করা উচিত? এই জিজ্ঞাসা দূর করার জন্য প্রভু বলছেন—
★🔗