**২.৩৮।** সুখদুঃখে সমকৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি।।
**অনুবাদ:** জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি ও সুখ-দুঃখকে সমানভাবে দেখে, তারপর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। এইভাবে যুদ্ধ করলে তুমি পাপভাগী হবে না।
**ভাষ্য:** অর্জুনের এই আশঙ্কা ছিল যে, যুদ্ধে আত্মীয়স্বজন বধ করলে আমাদের পাপ স্পর্শ করবে। কিন্তু এখানে প্রভু বলছেন, পাপের কারণ যুদ্ধ নয়, বরং নিজের কামনা। অতএব, কামনা ত্যাগ করে তুমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।
'সুখদুঃখে সমকৃত্বা... ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব' — যুদ্ধে প্রথমত জয়-পরাজয় ঘটে; জয়-পরাজয়ের ফল লাভ-ক্ষতি; আর লাভ-ক্ষতির ফল সুখ-দুঃখ। তোমার লক্ষ্য জয়-পরাজয় ও লাভ-ক্ষতিতে হর্ষিত বা বিষণ্ণ হওয়া নয়। তোমার লক্ষ্য এই তিনটিতেই সমচিত্ত থেকে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করা।
যুদ্ধে জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি ও সুখ-দুঃখ অবশ্যম্ভাবী। তাই তুমি প্রথমে এই সংকল্প করো যে, তোমাকে কেবল কর্তব্য করতেই হবে, আর জয়-পরাজয় প্রভৃতির সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তখন যুদ্ধ করলে পাপ স্পর্শ করবে না, অর্থাৎ সংসারের বন্ধন হবে না।
কামনাযুক্ত ও নিষ্কাম — উভয় ভাবেই নিজের কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করা প্রয়োজন। কামনাযুক্ত ব্যক্তির কর্তব্যকর্মে অলস বা অমনোযোগী হওয়া মোটেই উচিত নয়; বরং যত্ন সহকারেই তার কর্তব্য সম্পাদন করা উচিত। নিষ্কাম ভাবাপন্ন ব্যক্তি, যে নিজের মঙ্গল কামনা করে, সেও তার কর্তব্য যত্ন সহকারে সম্পাদন করবে।
সুখ আসলে ভাল লাগে, চলে গেলে মন্দ লাগে; দুঃখ আসলে মন্দ লাগে, চলে গেলে ভাল লাগে। তাহলে কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ? অর্থাৎ, দুটোই সমান, এক। সুতরাং সুখ-দুঃখে বুদ্ধির সমতাবোধ রক্ষা করে তোমার কর্তব্য সম্পাদন করা উচিত।
তোমার কোনো কর্মেই সুখলাভের লোভে আসক্তি থাকবে না, আর দুঃখভয়ের কারণে অনাসক্তি থাকবে না। কর্মে তোমার আসক্তি ও অনাসক্তি কেবলমাত্র শাস্ত্রানুসারেই হওয়া উচিত (গীতা ১৬.২৪)।
'নৈবং পাপমবাপ্স্যসি' — এখানে 'পাপ' শব্দটি দ্বারা পাপ ও পুণ্য উভয়কেই বোঝানো হয়েছে, যার ফল স্বরূপ-নরকলাভরূপ বন্ধন, যার কারণে মানুষ নিজের মঙ্গল থেকে বঞ্চিত হয়ে বারংবার জন্ম-মৃত্যু বরণ করে। প্রভু বলছেন: হে অর্জুন! সমতাবোধে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যুদ্ধরূপ কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করলে, পাপও তোমাকে বাঁধবে না, পুণ্যও বাঁধবে না।
**প্রসঙ্গ-সংক্রান্ত বিশেষ বিষয়:**
একত্রিশ থেকে আটত্রিশ — এই আটটি শ্লোকে প্রভু কয়েকটি গভীর ভাব প্রকাশ করেছেন; যেমন —
(১) যদি কাউকে উপদেশ দিয়ে কোনো বিষয় বুঝাতে হয়, তবে প্রভু এখানে এই আট শ্লোকে তার কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন, বিধি-নিষেধ — কর্তব্যকর্ম করা ও অকর্তব্য না করা — এর উপদেশ দিতে হলে, প্রথমে বিধি, মাঝে নিষেধ এবং শেষে আবার বিধি বর্ণনা করে উপদেশ শেষ করতে হয়। এখানেও প্রভু প্রথমে একত্রিশ ও বত্রিশ শ্লোকে কর্তব্যকর্ম করার সুফল বর্ণনা করেছেন; পরে মাঝে তেত্রিশ থেকে ছত্রিশ — এই চার শ্লোকে কর্তব্যকর্ম না করার ক্ষতি বর্ণনা করেছেন; এবং শেষে সাঁইত্রিশ ও আটত্রিশ শ্লোকে কর্তব্যকর্ম করার সুফল বর্ণনা করে কর্তব্যকর্ম করার আদেশ দিয়েছেন।
(২) অর্জুন প্রথম অধ্যায়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে যুক্তিগুলি দিয়েছিলেন, প্রভু এই আট শ্লোকে সেগুলির মীমাংসা করেছেন; যেমন: অর্জুন বলেন — যুদ্ধে কোনো মঙ্গল দেখছি না (১.৩১), তাই প্রভু বলেন — ক্ষত্রিয়ের পক্ষে ধর্মযুদ্ধের চেয়ে মঙ্গলের অন্য কোনো উপায় নেই (২.৩১)। অর্জুন বলেন — যুদ্ধ করে আমরা কীভাবে সুখী হব? (১.৩৭) তাই প্রভু বলেন — যে ক্ষত্রিয়রা এমন যুদ্ধ লাভ করেন, তারা নিশ্চয়ই সুখী হন (২.৩২)। অর্জুন বলেন — যুদ্ধের ফলে নরকলাভ হবে (১.৪৪) তাই প্রভু বলেন — যুদ্ধ করলে স্বর্গলাভ হবে (২.৩২, ৩৭)। অর্জুন বলেন — যুদ্ধ করলে পাপ স্পর্শ করবে (১.৩৬) তাই প্রভু বলেন — যুদ্ধ না করলে পাপ স্পর্শ করবে (২.৩৩)। অর্জুন বলেন — যুদ্ধ করলে ধর্ম নষ্ট হবে (১.৪০) তাই প্রভু বলেন — যুদ্ধ না করলে ধর্ম নষ্ট হবে (২.৩৩)।
(৩) অর্জুন জিদ করেছিলেন যে, যুদ্ধরূপ ভয়ঙ্কর কর্ম পরিত্যাগ করে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা আমার পক্ষে শ্রেয় (২.৫), তাই প্রভু তাকে যুদ্ধ করতে আদেশ দিলেন (২.৩৮); আর উদ्धবের ইচ্ছা ছিল প্রভুর সাথে থাকার, তাই প্রভু তাকে উত্তরাখণ্ডে গিয়ে তপস্যা করতে আদেশ দিলেন (শ্রীমদ্ভাগবত ১১.২৯.৪১)। অর্থ হলো, নিজের মনের জিদ ত্যাগ না করলে মঙ্গল হয় না। সেই জিদ, যেরূপই হোক না কেন, মুক্তির পথে বাধা দেয়।
(৪) প্রভু এই অধ্যায়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্লোকে সংক্ষেপে যে বিষয়গুলি বলেছিলেন, সেগুলি এখানে বিস্তারিত করেছেন; যেমন: সেখানে বলেছিলেন 'আর্যোচিত নয়', এখানে বলেছেন 'ক্ষত্রিয়ের পক্ষে এর চেয়ে বড় মঙ্গল নেই...'। সেখানে বলেছিলেন 'স্বর্গের পথ নয়', এখানে বলেছেন 'স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত'। সেখানে বলেছিলেন 'অপযশ আনে', এখানে বলেছেন 'লোকে তোমার চিরকালের অপযশ কীর্তন করবে'। সেখানে যুদ্ধের আদেশ দিয়েছিলেন — 'অতএব, হে পার্থ! যুদ্ধে দণ্ডায়মান হও' — এখানেও সেই আদেশ দিয়েছেন — 'তাহলে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও'।
**সংযোগ:** পূর্ববর্তী শ্লোকে প্রভু সমত্ববোধের কথা বলেছেন; পরবর্তী দুটি শ্লোকে সেই বিষয় শোনার আদেশ দিয়ে তার মহিমা বর্ণনা করেছেন।
★🔗