**৩.৩১:** যাহারা দোষারোপশূন্য ও শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া আমার এই মত (পূর্বশ্লোকে বর্ণিত) সর্বদা অনুসরণ করে, তাহারাও কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয়।
**ভাষ্য:** ব্যাখ্যা— 'যে মে মতম্ ইদম্... শ্রদ্ধাবন্তোঽনুসূযন্তঃ'— যদি কোনও মানুষ, কোনও বর্ণ, আশ্রম, ধর্ম, সম্প্রদায় ইত্যাদি নির্বিশেষে, কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইতে ইচ্ছা করে, তবে তাহাকে এই নীতিটি গ্রহণ করিয়া চলিতে হইবে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, বিষয়, কর্ম ইত্যাদি কিছুই নিজের নহে— এই সত্যটি যাহারা উপলব্ধি করে, তাহারাই কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয়। প্রভু ও তাঁহার মতের প্রতি যাহার দৃঢ়, অচল শ্রদ্ধা ও ভক্তি আছে, যেমন প্রত্যক্ষ বস্তুর প্রতি থাকে, তাহাকেই 'শ্রদ্ধাবন্তঃ' বলা হয়। দেহাদি জড় বস্তুকে নিজের বা নিজের জন্য বলিয়া মনে না করিলেই মানুষ মুক্ত হয়— এই সত্যে বিশ্বাস স্থাপন করিলে জড়ের সহিত কল্পিত সম্বন্ধ ত্যাগ করা সহজ হয়। কেবলমাত্র বিশ্বাসী সাধকই সৎশাস্ত্র, সৎসংবাদ ও সৎসঙ্গের উপদেশ শুনিয়া আচরণে প্রতিষ্ঠিত করে। পরমাত্মলাভের জন্যই মানবদেহ লাভ হয়। অতএব, যখন কেবলমাত্র পরমাত্মলাভের জন্য তীব্র, একনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়, তখন সাধকের মধ্যে স্বতঃই শ্রদ্ধা, অধ্যবসায়, ইন্দ্রিয়সংযম ইত্যাদি জন্মে। তাই সাধকের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য পরমাত্মলাভের আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রতর করা। পূর্বে (ত্রিংশ শ্লোকে) প্রভু তাঁহার মত ব্যক্ত করিয়াছেন; এখানে 'অনুসূযন্তঃ' (দোষারোপশূন্য) শব্দটি ইহাই নির্দেশ করিবার জন্য দেওয়া হইয়াছে যে, ইহার মধ্যে দোষারোপ করা উচিত নহে। গুণের মধ্যে দোষ দেখাকে 'অসূয়া' (দোষারোপ) বলে। যাহারা অসূয়ামুক্ত, তাহাদেরই এখানে 'অনুসূযন্তঃ' বলা হইয়াছে।
শ্রদ্ধা থাকিলেও কিছু পরিমাণে দোষারোপ থাকিতে পারে। তাই 'শ্রদ্ধাবন্তঃ' শব্দের সঙ্গে 'অনুসূযন্তঃ' শব্দটি যোগ করিয়া প্রভু মানুষকে সম্পূর্ণরূপে দোষারোপশূন্য (সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাসম্পন্ন) হইবার উপদেশ দিতেছেন। অনুরূপভাবে, গীতাশ্রবণের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিতে গিয়াও প্রভু 'শ্রদ্ধাবান্ অনসূয়শ্ চ' (গীতা ১৮.৭১) শব্দদ্বয় ব্যবহার করিয়া বলিয়াছেন যে, শ্রোতা শ্রদ্ধাসম্পন্ন ও দোষারোপশূন্য হইবেন। 'প্রভুর মত উত্তম, কিন্তু প্রভু কত আত্মপ্রশংসা ও অহংকারের কথা বলিতেছেন— সমস্তই কেবল আমার উদ্দেশ্যে অর্পণ করিতে হইবে', অথবা 'এই মত ভাল, কিন্তু কর্ম দ্বারা ঈশ্বরলাভ কিরূপে হইবে? কর্ম তো জড় ও বন্ধনকারী' ইত্যাদি চিন্তা প্রভুর মতের প্রতি দোষারোপ। সাধকের প্রভু বা তাঁহার মত— কোনওটির প্রতিই দোষারোপ করা উচিত নহে। বাস্তবিক পক্ষে, সমস্তই কেবল প্রভুর; কিন্তু মোহবশত মানুষ প্রভুর বস্তুকে নিজের বলিয়া মনে করে, বদ্ধ হয় এবং আসক্তি ও কামনার বশে কষ্ট পায়। তাই, এই স্বত্ববোধ ত্যাগ করাইয়া মানুষকে মুক্ত করিবার জন্য (যাহাতে তাহারা চিরসুখী হয়) প্রভু স্বীয় স্বভাবসিদ্ধ করুণাবশত সমস্তই তাঁহার উদ্দেশ্যে অর্পণ করিতে উপদেশ দেন। অতএব, এই বিষয়ে দোষারোপ করা অনুচিত। ইহা নিঃসন্দেহে প্রভুর পরম স্নেহ, করুণা ও মাতৃসুলভ প্রেম যে, স্বয়ং কোনও ত্রুটি বা অভাব না থাকিলেও তিনি কেবল মানুষের মঙ্গলের জন্যই সমস্ত কর্ম তাঁহার উদ্দেশ্যে অর্পণ করিতে বলিতেছেন।
প্রভুর মতই জগতে 'সিদ্ধান্ত' নামে অভিহিত। পরম সত্যকে এখানে 'মতম্' (মত) শব্দ দ্বারা নির্দেশ করা হইয়াছে। স্বীয় স্বভাবসিদ্ধ সরলতা ও অহংকারশূন্যতার জন্য প্রভু পরম সত্যটিকে 'মতম্' নামে অভিহিত করিতেছেন। এই মত বা সিদ্ধান্ত তিন কালেই একরূপ, অর্থাৎ ইহার কোনও পরিবর্তন হয় না, কেহ ইহাতে বিশ্বাস করুক বা না করুক। এখানে 'নিত্যম্' (সর্বদা) শব্দটি 'মতম্' এর বিশেষণ নহে, বরং 'অনুতিষ্ঠন্তি' (অনুসরণ করে) এর বিশেষণ। কারণ, প্রভু নিত্য; অতএব, তাঁহার সমস্ত বিষয়ও নিত্য। প্রভুর মতও নিত্য। প্রভুর মতই পরম সত্য, আর সত্য কখনও বিনষ্ট হয় না। তাই প্রভুর মত নিশ্চয়ই নিত্য এবং ইহার আচরণও নিত্য হওয়া উচিত। সুতরাং, এখানে 'নিত্যম্' এই ক্রিয়াবিশেষণ পদটি দেওয়ার উদ্দেশ্য— সর্বদা ও নিরন্তর প্রভুর মতেই অবস্থান করা ও তদনুযায়ী আচরণ করা।
**প্রশ্ন:** প্রভুর মত কি? এবং ইহা সর্বদা কিরূপে আচরণ করিতে হইবে?
**উত্তর:** প্রভুর মত এই যে, প্রাপ্ত কিছুই নিজের নহে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, প্রাণ, ধন, সম্পত্তি, বিষয়াদি— সমস্তই প্রকৃতির কার্য, এবং জগতও প্রকৃতির কার্য। অতএব, এই বস্তুগুলির জগতের সহিত একত্ব আছে, এবং পরমাত্মার অংশ হওয়ায় 'আত্মা'র পরমাত্মার সহিত একত্ব আছে। তাই এই বস্তুগুলি ব্যক্তিগত (নিজের) নহে; বরং ইহাদের ব্যবহারের অধিকার ব্যক্তিগত। ইহা ছাড়া, সদগুণ, সদাচার, বৈরাগ্য, বিতৃষ্ণা, দয়া, ক্ষমা ইত্যাদিও ব্যক্তিগত নহে, প্রভুর। এই সকল দৈবী সম্পদ, অর্থাৎ ঈশ্বরলাভের উপায়-স্বরূপ সম্পদ, কেবল প্রভুরই। যদি এই সকল গুণ, সদাচার ইত্যাদি নিজের হইত, তবে ইহাদের উপর আমাদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকিত, এবং আমাদের সম্মতি ব্যতীত অন্য কেহ ইহা লাভ করিতে পারিত না। ইহাদিগকে নিজের বলিয়া মনে করিলে অহংকার জন্মে, যাহা আসুরী সম্পদের মূল। যাহা নিজের নহে, তাহাকে নিজের বলিয়া মনে করিয়া তাহা লাভের জন্য কর্ম করিলেই বন্ধন জন্মে। দেহাদি বস্তু 'নিজের' নহে, আবার 'নিজের জন্য'ও নহে। যদি ইহা নিজের জন্য হইত, তবে ইহা লাভ করিলে আমরা সম্পূর্ণ তৃপ্তি বা পরিতোষ, পূর্ণতার অনুভূতি লাভ করিতাম। কিন্তু জাগতিক বস্তু যতই লাভ করি না কেন, কখনও তৃপ্তি হয় না। তৃপ্তি বা পূর্ণতার অনুভূতি হয় সেই বস্তু (প্রভু) লাভ করিলে, যাহা সত্যই নিজের। নিজের সত্যিকার বস্তু লাভ করিলে স্বপ্নেও অন্য কিছু লাভের ইচ্ছা থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, জগতে পুত্রবতী সকল নারীই মাতা, কিন্তু একটি শিশু সকল মাতাকে লাভ করিয়া তৃপ্ত হয় না; বরং নিজের মাতাকে লাভ করিলেই তৃপ্তি হয়। অনুরূপভাবে, যতক্ষণ আরও লাভ করিবার ইচ্ছা থাকে, ততক্ষণ বুঝিতে হইবে যে নিজের বস্তু লাভ হয় নাই। প্রাপ্ত বস্তুকে নিজের বলিয়া ভ্রম করিতে পারি, কিন্তু বাস্তবে তাহা নিজের নহে, এবং তাই তৃপ্তি দেয় না। অতএব, প্রাপ্ত কিছুই নিজের বা নিজের জন্য নহে।
দেহাদি বস্তু আমরা সঙ্গে আনি নাই, আবার সঙ্গে লইয়াও যাইতে পারি না; বর্তমানেও ইহারা প্রতি মুহূর্তে আমাদের হইতে বিচ্ছিন্ন হইতেছে। বর্তমানে ইহারা নিজের বলিয়া প্রতীয়মান হয়, ইহাদের সদ্ব্যবহারের জন্য, অর্থাৎ পরহিতের জন্য ইহাদের নিয়োগ করিবার জন্য, ইহাদের উপর স্বত্ব স্থাপন করিবার জন্য নহে। অতএব, আমরা কেবল প্রাপ্ত বস্তুগুলির সদ্ব্যবহার করিবার অধিকারী, ইহাদিগকে নিজের বলিয়া মনে করিবার অধিকারী নহি। প্রভু বস্তুগুলি মানুষকে এমনই উদারভাবে ও এমনভাবে দিয়াছেন যে, ইহারা তাহাদের নিজের বলিয়া মনে হয়। এই বস্তুগুলিকে নিজের বলিয়া মনে করা প্রভুর উদারতার অপব্যবহার। যাহা নিজের নহে, তাহাকে নিজের বলিয়া ভ্রম হয়, সেই মোহ দূর করিবার জন্য সাধককে আধ্যাত্মিক চিন্তা দ্বারা গভীরভাবে চিন্তা করিয়া ইহাদিগকে প্রভুর উদ্দেশ্যে অর্পণ করিতে হইবে, অর্থাৎ ভ্রমজাত স্বত্ববোধ দূর করিতে হইবে।
যে সাধকের একমাত্র লক্ষ্য আধ্যাত্মিক সত্য (পরমাত্মা) লাভ, সে যদি গভীরভাবে চিন্তা করে, তবে স্পষ্ট বুঝিতে পারিবে যে, প্রাপ্ত কিছুই নিজের নহে; বরং ইহা এমন কিছু যাহা বিচ্ছিন্ন হইবে। যাহা কিছু প্রাপ্ত হইয়াছে— দেহ, পদ, ক্ষমতা, শিক্ষা, যোগ্যতা, ধন, সম্পত্তি, ভূমি ইত্যাদি— জগত হইতে প্রাপ্ত হইয়াছে এবং জগতের জন্যই। প্রাপ্ত বস্তুকে জগতের (কার্য) বলিয়া মনে কর, প্রকৃতির (কারণ) বলিয়া মনে কর, কিংবা প্রভুর (স্বামী) বলিয়া মনে কর— মূল কথা ইহা নিজের নহে। যাহা নিজের নহে, তাহা নিজের জন্য কিরূপে হইতে পারে?
সাধকের কোনও 'বস্তু'কেই নিজের বলিয়া মনে করা উচিত নহে, আবার কোনও 'কর্ম'ও নিজের জন্য করা উচিত নহে। নিজের জন্য করা কর্ম বন্ধনকারী (গীতা ৩.৯), অর্থাৎ যজ্ঞ (পরহিতার্থে নিঃস্বার্থভাবে করা কর্তব্য-কর্ম) ব্যতীত অপর (নিজের জন্য করা) কর্ম মানুষকে বদ্ধ করে। যে সাধক যজ্ঞার্থে কর্ম করে, তাহার সকল কর্ম, এমনকি সঞ্চিত কর্মও বিনষ্ট হয় (গীতা ৪.২৩)। প্রভু সকল লোকের মহেশ্বর— 'সর্বলোকমহেশ্বরম্' (গীতা ৫.২৯)। মানুষ যখন নিজেকে বস্তুর স্বামী বলিয়া মনে করে, তখন সে নিজের প্রকৃত স্বামীকে ভুলিয়া যায়; কারণ সে কেবল সেই সকল বস্তুরই চিন্তা করে যাহার সে নিজেকে স্বামী বলিয়া মনে করে। তাই, প্রভুকে জগতের একমাত্র স্বামী বলিয়া মনে করিয়া সাধককে দাসের ন্যায় জগতে বাস করিতে হইবে। দাস, প্রভুর জন্য সমস্ত কাজ করিলেও কখনও নিজেকে প্রভু বলিয়া মনে করে না। অতএব, সাধকের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, বিষয়াদিকে নিজের বলিয়া মনে না করিয়া, ইহাদিগকে কেবল প্রভুরই বলিয়া মনে করিয়া কর্তব্য নির্বাহ করিতে হইবে; কর্ম করিতে গিয়া সে যেন কেবল একটি মাধ্যমমাত্র হয়। তাহার মনে স্বত্বের অহংকার থাকা উচিত নহে।
সমস্তই প্রভুর উদ্দেশ্যে অর্পণ করিবার পর, যাহা কিছু আসে— লাভ বা ক্ষতি, মান বা অপমান, সুখ বা দুঃখ ইত্যাদি— সাধককেও তাহা প্রভুরই বলিয়া মনে করিয়া ইহাদের বিষয়ে কোনও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রাখা উচিত নহে। কর্তব্য কেবলমাত্র পরিবেশ অনুযায়ী হয়। পরিবেশ অনুযায়ী সে প্রফুল্লচিত্তে নিজের কর্তব্য করিয়া যাইবে। ইহাই প্রভুর মত সর্বদা অনুসরণ করা।
'মুচ্যন্তে তেহপি কর্মভিঃ'— প্রভু যেন অর্জুনকে বলিতেছেন: আমি তোমাকে সমস্তই আমার উদ্দেশ্যে অর্পণ করিয়া কর্তব্য-কর্ম করিবার জন্য স্পষ্ট আদেশ দিতেছি; অতএব, আমার আদেশ পালন করিলে তোমার মুক্তিতে কোনও সন্দেহ নাই; কিন্তু যাহাদের আমি এরূপ স্পষ্ট আদেশ দিই না, তাহারাও যদি এই মত অনুযায়ী আচরণ করে (প্রাপ্ত বস্তুকে নিজের বলিয়া না মনে করিয়া কর্তব্য-কর্ম করে), তবে তাহারাও মুক্ত হইবে। কারণ, এই মত এমন যে, কেহ আমাতে বিশ্বাস করুক বা না করুক, কেবল এই মত অনুসরণ করিলেই মানুষ মুক্ত হয়।
★🔗