**অনুবাদ:**
**ভগবদ্গীতা, প্রথম অধ্যায়, প্রথম শ্লোকের ভাষ্য**
**মূল শ্লোক:**
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ –
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।
**ভাষ্য:**
**১. ব্যাখ্যা –** ‘ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে’ – কুরুক্ষেত্রে দেবতারা যজ্ঞ করেছিলেন। রাজা কুরুরও এখানে তপস্যা ছিল। যজ্ঞাদি ধর্মকর্মের স্থান হওয়ায় এবং রাজা কুরুর তপস্যার ভূমি হওয়ায় একে পবিত্র কুরুক্ষেত্র বলা হয়।
এখানে ‘ধর্মক্ষেত্রে’ ও ‘কুরুক্ষেত্রে’ – এই ‘ক্ষেত্র’ শব্দ প্রয়োগ করে ধৃতরাষ্ট্রের ইঙ্গিত হলো, এটা তার কুরুবংশের ভূমি। এটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং একটি পবিত্র ভূমি, যেখানে জীবিত অবস্থায় প্রাণীরা পবিত্র কর্ম করতে পারে এবং তাদের মঙ্গল লাভ করতে পারে। এইভাবে, ইহলোক ও পরলোকের সমস্ত মঙ্গল লাভের কথা বিবেচনা করে এবং সজ্জনদের পরামর্শ নিয়ে এই ভূমিতেই যুদ্ধের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
লোকে সাধারণত তিনটি বিষয় নিয়ে বিবাদ করে – ভূমি, ধন ও নারী। এই তিনটির মধ্যে রাজারা প্রধানত ভূমি নিয়ে পরস্পর যুদ্ধ করে। এখানে ‘কুরুক্ষেত্রে’ শব্দ প্রয়োগের ইঙ্গিতও হলো ভূমি নিয়ে যুদ্ধ। কুরুবংশে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র ও পাণ্ডুর পুত্ররা সকলেই এক। কুরুবংশীয় হওয়ায় উভয়েরই কুরুক্ষেত্র অর্থাৎ রাজা কুরুর ভূমির ওপর সমান অধিকার। তাই (কৌরবরা পাণ্ডবদের তাদের ভূমি না দেওয়ায়) উভয়েই ভূমি নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছে।
যদিও নিজেদের ভূমি হওয়ায় উভয়ের ক্ষেত্রেই ‘কুরুক্ষেত্রে’ শব্দ প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত, তবুও আমাদের চিরন্তন বৈদিক সংস্কৃতি এতই ব্যতিক্রমী যে, যখনই কোনো কাজ করা হয়, তাতে ধর্মকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। যুদ্ধের মতো কাজটিও কেবলমাত্র একটি পবিত্র ভূমিতে – একটি ধর্মীয় ভূমিতে – করা হয়, যাতে যুদ্ধে যারা প্রাণ ত্যাগ করে, তারা মুক্তি লাভ করতে পারে, মঙ্গল লাভ করতে পারে। তাই এখানে ‘কুরুক্ষেত্রে’ শব্দের সঙ্গে ‘ধর্মক্ষেত্রে’ শব্দটিও এসেছে।
এখানে প্রথমেই ‘ধর্ম’ শব্দটি আরও একটি বিষয় প্রকাশ করছে। প্রথম শব্দ ‘ধর্ম’-এর ‘ধর’ বর্ণ এবং অষ্টাদশ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকের ‘মম’ শব্দের ‘ম’ বর্ণ নিয়ে ‘ধর্ম’ শব্দটি গঠিত হয়। তাই সমগ্র গীতাই ধর্মের মধ্যে পরিব্যাপ্ত, অর্থাৎ ধর্মের অনুসরণ করলেই গীতার নীতির অনুসরণ হয় এবং গীতার নীতি অনুযায়ী কর্তব্যকর্ম করলেই ধর্মাচরণ হয়।
‘ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে’ এই শব্দদ্বয় থেকে সমস্ত মানুষের এই শিক্ষা নেওয়া উচিত: যে কোনো কাজ করতে হলে তাতে ধর্মকেই প্রাধান্য দিতে হবে। প্রতিটি কাজই শুধু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দৃষ্টিতে নয়, বরং সকলের মঙ্গলের দৃষ্টিতে সম্পাদন করতে হবে; এবং কী করা উচিত ও কী করা উচিত নয়, তা শাস্ত্রকেই প্রমাণ মানতে হবে (গীতা ১৬.২৪)।
‘যুযুৎসবঃ সমবেতাঃ’ – বারবার জ্যেষ্ঠদের শান্তি প্রস্তাব সত্ত্বেও দুর্যোধন শান্তি স্থাপন করতে রাজি হয়নি। শুধু তাই নয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুরোধেও আমার পুত্র দুর্যোধন স্পষ্ট বলে দিয়েছে যে, যুদ্ধ ছাড়া সে পাণ্ডবদের সুচের ডগার সমান ভূমিও দেবে না। (ভাষ্য পৃ. ২.১) তখন, বাধ্য হয়ে পাণ্ডবরাও যুদ্ধ করতে সম্মত হয়। এইভাবে, আমার পুত্ররা ও পাণ্ডুর পুত্ররা – উভয়েই তাদের সৈন্যবাহিনীসহ যুদ্ধের ইচ্ছা নিয়ে সমবেত হয়েছে।
যদিও উভয় বাহিনীরই যুদ্ধের ইচ্ছা ছিল, তবুও দুর্যোধনের বিশেষভাবে যুদ্ধের প্রবল ইচ্ছা ছিল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল কেবল রাজ্যলাভ। তার ভাবনা ছিল যে, যেকোনো উপায়ে – ধর্মে বা অধর্মে, ন্যায়ে বা অন্যায়ে, বিহিত পথে বা নিষিদ্ধ পথে – আমাদের রাজ্যটি পেতেই হবে। তাই বিশেষভাবে দুর্যোধন পক্ষই ছিল ‘যুযুৎসু’, অর্থাৎ যুদ্ধেচ্ছু।
পাণ্ডবদের মধ্যে ধর্মই ছিল প্রধান। তাদের ভাবনা ছিল যে, আমরা যেকোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারি, কিন্তু আমাদের ধর্মে কোনো বাধা আসতে দেব না, আমরা ধর্মবিরুদ্ধ কাজ করব না। এই কারণে মহারাজ যুধিষ্ঠির যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কিন্তু, যাঁর আদেশে যুধিষ্ঠির তাঁর চার ভাইসহ দ্রৌপদীকে বিবাহ করেছিলেন, সেই মাতার আদেশ পালনের ধর্মবশতই মহারাজ যুধিষ্ঠির যুদ্ধের দিকে ঝুঁকেছিলেন (ভাষ্য পৃ. ২.২)। অর্থাৎ, মাতৃআজ্ঞা পালনের ধর্মবশতই যুধিষ্ঠির যুদ্ধেচ্ছু হয়েছিলেন। অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, দুর্যোধন প্রমুখ রাজ্যলাভের জন্য ‘যুযুৎসু’ হয়েছিলেন, আর পাণ্ডবরা কেবল ধর্মরক্ষার জন্যই ‘যুযুৎসু’ হয়েছিলেন।
‘মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব’ – পাণ্ডবরা ধৃতরাষ্ট্রকে (পিতার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে) পিতৃতুল্য জ্ঞান করে তাঁর আদেশ পালন করতেন। ধৃতরাষ্ট্র অনুচিত আদেশ দিলেও পাণ্ডবরা, ঠিক-বেঠিক বিবেচনা না করে, তাঁর আদেশ পালন করতেন। তাই এখানে ‘মামকাঃ’ শব্দের অন্তর্গত হলো কৌরবরা (ভাষ্য পৃ. ৩.১) এবং পাণ্ডবরা উভয়েই। তবুও ‘পাণ্ডবাঃ’ পৃথক শব্দ প্রয়োগের ইঙ্গিত হলো যে, ধৃতরাষ্ট্রের নিজের পুত্র ও পাণ্ডুর পুত্রদের প্রতি সমান স্নেহ ছিল না। তাঁর নিজের পুত্রদের প্রতি পক্ষপাত, আসক্তি ছিল। তিনি দুর্যোধন প্রমুখকে নিজের বলে মনে করতেন, কিন্তু পাণ্ডবদের নিজের বলে মনে করতেন না। (ভাষ্য পৃ. ৩.২) এই কারণেই তিনি নিজের পুত্রদের জন্য ‘মামকাঃ’ শব্দ এবং পাণ্ডুর পুত্রদের জন্য ‘পাণ্ডবাঃ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন; কারণ অন্তরের ভাবনাই সাধারণত বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই দ্বৈতভাবের কারণে ধৃতরাষ্ট্রকে নিজের বংশধ্বংসের শোক ভোগ করতে হয়েছিল। এ থেকে সমস্ত মানুষের এই শিক্ষা নেওয়া উচিত: তাদের গৃহে, পাড়ায়, গ্রামে, প্রদেশে, দেশে বা সম্প্রদায়ে দ্বৈতভাব – এরা আমাদের, এরা পর – পোষণ করা উচিত নয়। কারণ দ্বৈতভাব থেকে পরস্পরের প্রতি প্রেম-স্নেহের উদ্রেক হয় না; বরং বিবাদের সৃষ্টি হয়।
এখানে ‘পাণ্ডবাঃ’ শব্দের সঙ্গে ‘এব’ (নিশ্চয়ই) শব্দ প্রয়োগের ইঙ্গিত হলো যে, পাণ্ডবরা মহান ধার্মিক; তাই তাদের যুদ্ধ করা উচিত ছিল না। কিন্তু তারাও তো যুদ্ধ করতে যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছে, তাই সেখানে এসে তারা কী করল?
‘মামকাঃ’ ও ‘পাণ্ডবাঃ’ (ভাষ্য পৃ. ৩.৩) – এই বিষয়ে সঞ্জয় পরবর্তী (দ্বিতীয়) শ্লোক থেকে ত্রয়োদশ শ্লোক পর্যন্ত প্রথমে ‘মামকাঃ’-এর উত্তর দেবেন: যে আপনার পুত্র দুর্যোধন, পাণ্ডব সেনা দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে পাণ্ডব পক্ষের প্রধান সেনাপতিদের নাম করে দ্রোণের মনে তাদের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করলেন। তারপর দুর্যোধন নিজের সেনার প্রধান যোদ্ধাদের নাম করে তাদের যুদ্ধনৈপুণ্য ইত্যাদির প্রশংসা করলেন। দুর্যোধনকে সন্তুষ্ট করতে ভীষ্ম তাঁর শঙ্খ অতি জোর দিয়ে বাজালেন। তা শুনে কৌরব সেনায় শঙ্খ ও অন্যান্য বাদ্য বাজল। তারপর চতুর্দশ থেকে উনবিংশ শ্লোক পর্যন্ত তিনি ‘পাণ্ডবাঃ’-এর উত্তর দেবেন: যে পাণ্ডব পক্ষে শ্রীকৃষ্ণ রথে উপবিষ্ট হয়ে তাঁর শঙ্খ বাজালেন। তারপর অর্জুন, ভীম, যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব নিজ নিজ শঙ্খ বাজিয়ে দুর্যোধন সেনার হৃদয় কম্পিত করলেন। তারপরও পাণ্ডবদের বিষয় বলতে বলতে সঞ্জয় বিংশ শ্লোক থেকে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জুনের সংলাপের প্রসঙ্গ শুরু করবেন।
‘কিমকুর্বত’ – ‘কিম্’ শব্দের তিনটি অর্থ – সন্দেহ, নিন্দা (অপবাদ), ও প্রশ্ন।
যুদ্ধ হয়েছে কি না – এই সন্দেহের অর্থ এখানে গ্রহণ করা যায় না; কারণ দশ দিন ধরে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই চলছে, এবং ভীষ্মকে রথ থেকে ভূপাতিত করার পর সঞ্জয় হস্তিনাপুরে এসে ধৃতরাষ্ট্রকে সেখানে ঘটনাবলি বর্ণনা করছেন।
নিন্দা বা অপবাদ – ‘আমার পুত্র ও পাণ্ডুর পুত্ররা কী করল যে, তারা যুদ্ধে লিপ্ত হল! তাদের যুদ্ধ করা উচিত ছিল না’ – এই অর্থও এখানে গ্রহণ করা যায় না; কারণ যুদ্ধ ইতিমধ্যেই চলমান, এবং ধৃতরাষ্ট্রের অন্তরে নিন্দা করে জিজ্ঞাসা করার ভাবনা ছিল না।
এখানে ‘কিম্’ শব্দের প্রশ্নবাচক অর্থ গ্রহণ করাই যথার্থ। ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছে ধারাবাহিকভাবে ও বিস্তারিতভাবে সমস্ত ঘটনা – ছোট-বড় – সঠিকভাবে জানতে প্রশ্নটি করছেন।
**সংযোগ:** সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শুরু করবেন পরবর্তী শ্লোক থেকে।
★🔗