BG 3.10 — কর্ম যোগ
BG 3.10ⓘ📚 Go to Chapter 3
सहयज्ञाःप्रजाःसृष्ट्वापुरोवाचप्रजापतिः|अनेनप्रसविष्यध्वमेषवोऽस्त्विष्टकामधुक्||३-१०||
সহয়জ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ | অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোঽস্ত্বিষ্টকামধুক্ ||৩-১০||
सहयज्ञाः: together with sacrifice | प्रजाः: mankind | सृष्ट्वा: having created | पुरोवाच: in the beginning | प्रजापतिः: Prajapati (the Creator) | अनेन: by this | प्रसविष्यध्वमेष: shall ye propagate | वोऽस्त्विष्टकामधुक्: your
GitaCentral বাংলা▲
প্রজাপতি (স্রষ্টা) আদিতে যজ্ঞসহ প্রজা সৃষ্টি করে বললেন, 'এতে তোমরা বৃদ্ধি পাও; এই যজ্ঞ তোমাদের ইচ্ছিত কামনা পূর্ণকারিণী (ইষ্টকামধুক্) গাভী হোক।'
★
🙋 বাংলা Commentary▲
শব্দার্থ: সহযজ্ঞাঃ - যজ্ঞের সাথে, প্রজাঃ - মানবজাতি, সৃষ্ট্বা - সৃষ্টি করে, পুরা - আদিতে, উবাচ - বললেন, প্রজাপতিঃ - সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, অনেন - এর দ্বারা, প্রসবিষ্যধ্বম্ - তোমরা বৃদ্ধি পাও, এষঃ - এটি, বঃ - তোমাদের, অস্তু - হোক, ইষ্টকামধুক - মনস্কামনা পূরণকারী কামধেনু। ব্যাখ্যা: প্রজাপতি হলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা। কামধুক হলো কামধেনু গাভীর অপর নাম। কামধেনু হলো ইন্দ্রের সেই দিব্য গাভী, যার থেকে প্রত্যেকেই নিজেদের অভীষ্ট বস্তু লাভ করতে পারে।
★
English
Swami Gambirananda
Swami Adidevananda
Hindi
Swami Ramsukhdas
Sanskrit
Sri Ramanuja
Sri Madhavacharya
Sri Anandgiri
Sri Jayatirtha
Sri Abhinav Gupta
Sri Madhusudan Saraswati
Sri Sridhara Swami
Sri Dhanpati
Vedantadeshikacharya Venkatanatha
Sri Purushottamji
Sri Neelkanth
Sri Vallabhacharya
Detailed Commentary▲
**৩.১০** সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রজাদের (প্রধানত মানুষদের) সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যকর্তব্য বিধান সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন— “এই কর্তব্য দ্বারা তোমরা সকলে সবার কল্যাণ সাধন করো এবং যজ্ঞরূপে এই কর্তব্য তোমাদের কর্তব্য পালনের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেন সরবরাহ করে। তোমাদের অবশ্যকর্তব্যদ্বারা দেবতারা যেন উন্নত হন এবং সেই দেবতারা তাদের কর্তব্যদ্বারা তোমাদের যেন উন্নত করেন। এইভাবে পরস্পরকে উন্নত করে তোমরা পরম শুভ লাভ করবে।” **ভাষ্য:** শ্লোকে বলা হয়েছে— ‘সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ’— ব্রহ্মা হচ্ছেন প্রজাদের (সৃষ্টির) স্রষ্টা ও প্রভু; তাই তিনি নিজ কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের রক্ষা ও কল্যাণের বিষয়েও নিরন্তর চিন্তা করেন। কারণ, যিনি সৃষ্টি করেন, সেই সৃষ্ট বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ করা তাঁর কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। ব্রহ্মা প্রজাদের সৃষ্টি করেন, তাদের রক্ষায় তৎপর থাকেন এবং সর্বদা তাদের মঙ্গল চিন্তা করেন। তাই তাঁকে ‘প্রজাপতি’ বলা হয়। সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মা মানুষকে অবশ্যকর্তব্য পালনের যোগ্যতা ও বিবেকবুদ্ধি দান করে সৃষ্টি করেছিলেন (দ্রষ্টব্য পৃ. ১২৮)। অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতির যথাযথ ব্যবহারই কল্যাণ বয়ে আনে। তাই ব্রহ্মা মানুষকে অনুকূল-প্রতিকূল উভয় পরিস্থিতি যথাযথভাবে ব্যবহার করার বিবেকবুদ্ধি দান করে সৃষ্টি করেছিলেন। ভালো-মন্দ বিচারে পশু-পাখি-বৃক্ষাদি স্বভাবতই পরোপকারী কাজ (কর্তব্য পালন) করে থাকে; কিন্তু মানুষ দৈবকৃপায় বিশেষ বিবেকশক্তি লাভ করেছে। তাই তারা যদি নিজেদের বিবেকের মূল্য দেয় এবং অনুচিত কাজ থেকে বিরত থাকে, তাহলে তাদের দ্বারাও বিশ্বের স্বভাবসিদ্ধ কল্যাণকর কাজগুলো সংঘটিত হতে পারে। দেবতা, ঋষি, পিতৃলোক, মানুষ ও অন্যান্য পশু-পাখি-বৃক্ষাদি সবাই প্রজা। এদের মধ্যে বিশেষ যোগ্যতা, অধিকার ও উপায়ের কারণে অন্যান্য সকল প্রজার ভরণপোষণের দায়িত্ব মানুষের উপর ন্যস্ত। তাই এখানে ‘প্রজাঃ’ শব্দটি বিশেষভাবে মানুষের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। কর্মযোগ চিরন্তন। চতুর্থ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে ‘পুরাতনঃ’ শব্দের মাধ্যমে প্রভু এও বলেছেন যে, এই কর্মযোগ প্রাচীনকাল থেকেই প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, যা আমি এখন তোমাকে পুনরায় বললাম। এখানেও ‘পুরা’ শব্দের মাধ্যমে তিনি অন্য উপায়ে একই কথা বলছেন— ‘কেবল আমি নই, ব্রহ্মাও সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাদের কর্তব্যসহ সৃষ্টি করে সেই কর্মযোগই আচরণের আদেশ দিয়েছিলেন।’ ইঙ্গিত হচ্ছে যে, নিষ্কামভাবে অবশ্যকর্তব্য পালনের কর্মযোগের প্রথা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। এটি নতুন কিছু নয়। চতুর্থ অধ্যায়ে (২৪ থেকে ৩০ শ্লোক) পরমাত্মা লাভের জন্য বর্ণিত সমস্ত সাধনকে ‘যজ্ঞ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে; যেমন— দ্রব্য-যজ্ঞ, তপো-যজ্ঞ, যোগ-যজ্ঞ, প্রাণায়াম ইত্যাদি। সাধারণভাবে ‘যজ্ঞ’ শব্দের অর্থ অগ্নিতে হবনাদি ক্রিয়া বলে জনপ্রিয় ধারণা রয়েছে; কিন্তু গীতায় ‘যজ্ঞ’ শব্দটি শাস্ত্রবিধি-নির্দিষ্ট সমস্ত কর্মকেও নির্দেশ করে। বর্ণ, আশ্রম, ধর্ম, স্বভাব, দেশ, কাল ইত্যাদি অনুসারে প্রাপ্ত অবশ্যকর্তব্যগুলো ‘যজ্ঞ’-এর অন্তর্ভুক্ত। পরহিতসাধনের ভাবনা নিয়ে সম্পাদিত সমস্ত কর্মও ‘যজ্ঞ’ই। এমন যজ্ঞ (কর্তব্য) পালনের দায়িত্ব একমাত্র মানুষের উপরই ন্যস্ত। ‘অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোঽস্ত্বিষ্টকামধুক্’ (দ্রষ্টব্য পৃ. ১২৯.১)— ব্রহ্মা মানুষকে বলছেন— “তোমরা সকলে নিজ নিজ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে সবার উন্নতি সাধন করো, উৎকর্ষ লাভ করাও! এমন করলে কর্তব্য পালনের উপযোগী উপকরণাদি তোমরা নিরন্তর লাভ করতে থাকবে; তার কোনোই অভাব হবে না।” অর্জুনের নিষ্ক্রিয়তার প্রবণতা দূর করতে প্রভু বলছেন যে, প্রজাপতি ব্রহ্মার বাক্য থেকেও তুমি অবশ্যকর্তব্য পালনের উপদেশ গ্রহণ করো। পরের কল্যাণের জন্য কর্তব্য পালন করলেই তোমার পার্থিব ও পারলৌকিক উন্নতি সম্ভব। নিষ্কামভাবে, কেবল কর্তব্যপালনের কথা চিন্তা করে কর্ম করলে মানুষ মুক্ত হয়; আর কামনাপ্রসূতভাবে কর্ম করলে মানুষ বদ্ধ হয়। এখানে আলোচ্য বিষয় নিষ্কামভাবে সম্পাদিত কর্তব্য। তাই এখানে ‘ইষ্টকাম’ শব্দের অর্থ ‘ভোগের বস্তু’ (যা কামনাপ্রসূত ভাব নির্দেশ করে) গ্রহণ করা সঙ্গত বলে মনে হয় না। এখানে এই শব্দের অর্থ— যজ্ঞ (অবশ্যকর্তব্য) পালনের প্রয়োজনীয় উপকরণাদি (দ্রষ্টব্য পৃ. ১২৯.২)। একজন কর্মযোগী সর্বদা পরসেবা বা পরোপকারে আগ্রহী। তাই প্রজাপতি ব্রহ্মার বিধান অনুসারে, পরসেবার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, শক্তি ও দৈহিক পোষণের অপরিহার্য সামগ্রীর কোনোই অভাব তার হয় না। এই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সে সহজেই ও নিরন্তর লাভ করে। ব্রহ্মার বিধান অনুসারে, কর্তব্য পালনের জন্য যে যতটুকু উপকরণ লাভ করেছে, সেই ব্যক্তির কর্তব্য পালনের জন্য তা সম্পূর্ণরূপে যথেষ্ট। কারো কর্তব্য পালনের উপকরণ কখনো অসম্পূর্ণ থাকে না। ব্রহ্মার বিধানে কোনোই ব্যতিক্রম হতে পারে না; কারণ তিনি যখন কর্তব্য পালনের বিধান স্থাপন করেছেন, তখন সেই কর্তব্য পালনের জন্য যথেষ্ট উপকরণ সরবরাহ করাও একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভরশীল। বাস্তবে মানুষের দেহ ভোগের জন্য নয়— ‘এই দেহ ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য নয়’ (মানস ৭.৪৪.১)। তাই কোনো সত্য শাস্ত্রেই ‘সংসার সুখ ভোগ করো’— এমন কোনো আদেশ বা বিধান নেই। সমাজেও অবাধে সুখভোগের অনুমতি নেই। বরং শাস্ত্র ও সমাজ উভয়েই পরকে সুখী করার আদেশ বা বিধান দেয়। যেমন— পিতা পুত্রকে লালন-পালন ও প্রতিপালন করার বিধান পান, কিন্তু পিতা পুত্রের সেবা পাবেন— এমন বিধান কোথাও নেই। অনুরূপভাবে পুত্র, স্ত্রী ইত্যাদি অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বুঝতে হবে। একজন কর্মযোগী সর্বদা দানের ভাব রাখে, গ্রহণের ভাব রাখে না; কারণ গ্রহণের ভাব বন্ধনকারী। গ্রহণের ভাব রাখলে কেবল মুক্তিলাভেই বাধা পড়ে না, পার্থিব বস্তু লাভেও বিঘ্ন ঘটে। প্রায় সবাইই অনুভব করে যে, সংসারে গ্রহণের ভাব যার থাকে, তাকে কেউই দিতে চায় না। তাই ব্রহ্মা বলছেন যে, কেবল নিষ্কামভাবে, নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্য পালন করলেই মানুষ তার নিজের উন্নতি (কল্যাণ) সাধন করতে পারে। ‘দেবান্ ভাবয়তানেন’— এখানে ‘দেব’ শব্দটি নির্দেশক; তাই এই শব্দের অন্তর্গত করে মানুষ, দেবতা, ঋষি, পিতৃলোক ইত্যাদি সকল প্রজাকেই বুঝতে হবে। কারণ একজন কর্মযোগীর লক্ষ্য হলো তার অবশ্যকর্তব্যদ্বারা সকল প্রজাকে সুখী করা। তাই এখানে ব্রহ্মা সকল প্রজার উন্নতির জন্য মানুষকে তাদের অবশ্যকর্তব্যের যজ্ঞ পালনের নির্দেশ দিচ্ছেন। নিজ নিজ কর্তব্য পালন করলে মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল্যাণ লাভ করে (গীতা ১৮.৪৫)। কর্তব্য পালনের নির্দেশ গ্রহণের পূর্ণ যোগ্যতা একমাত্র মানুষেরই আছে। একমাত্র মানুষই কর্ম করার স্বাধীনতা লাভ করেছে; তাই তাদের এই স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করা উচিত। ‘তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ’— যেমন— গাছ, লতা ইত্যাদিতে ফুল-ফল স্বভাবতই জন্মায়; কিন্তু সেগুলোকে সার-পানি দিলে সেগুলোতে ফুল-ফল বিশেষভাবে ভালো জন্মে। অনুরূপভাবে, পূজা-অর্চনার মাধ্যমে দেবতাদের পোষণ করা হয়, যার ফলে তাদের ক্রিয়া-কলাপ বিশেষভাবে ন্যায়সংগত হয়। কিন্তু মানুষ যখন তাদের অবশ্যকর্তব্যদ্বারা দেবতাদের পূজা না করে, তখন দেবতারা পোষণ লাভ করেন না, যার ফলে তাদের কর্তব্য পালনের সামর্থ্য হ্রাস পায়। তাদের এই কর্তব্য পালনের হ্রাসের কারণেই সংসারে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি দুর্ঘটনা ঘটে। ‘পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ’— এই শব্দগুলোর অর্থ এভাবে বুঝতে হবে না যে, অন্যরা আমাদের সেবা করলে আমরা তাদের সেবা করব। বরং এভাবে বুঝতে হবে— অন্যরা আমাদের সেবা করুক বা না করুক, আমাদের কর্তব্যদ্বারা তাদের সেবা করতেই হবে। অন্যরা কী করে বা না করে; তারা আমাদের সুখ দেয় কি দুঃখ দেয়— এসব বিষয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা থাকা উচিত নয়; কারণ যে ব্যক্তি অন্যের কর্তব্যের দিকে তাকায়, সে নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়। ফলে তার পতন ঘটে। অন্যের উপর কর্তব্য পালন করানো তো অধিকারের বিষয়ও নয়। আমাদের কেবল সবার কল্যাণের জন্য নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে এবং তাতে সবার সুখ বিধান করতে হবে। সেবায় আমাদের বুদ্ধি, শক্তি, সময় বা উপকরণের সামান্য অংশও নিজের জন্য রেখে দিলে চলবে না। তবেই জড়তার সঙ্গে সম্পূর্ণ ছেদ ঘটবে। আমাদের সকল পার্থিব আত্মীয়— মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই, ভাবী ইত্যাদির সেবা করতে হবে। এই সম্পর্কগুলো নিজের সুখভোগের জন্য নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের স্বরূপ অনুসারে, তাদের সেবা করা, যথাযথভাবে তাদের সুখী করা— এটাই আমাদের কর্তব্য। তাদের কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা রাখা এবং তাদেরকে নিজের কর্তৃত্বাধীন মনে করা— এটি গুরুতর ভুল। আমরা তাদের কাছে ঋণী এবং সেই ঋণ শোধ করতেই আমরা তাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছি। তাই নিঃস্বার্থভাবে সেই আত্মীয়দের সেবা করে সেই ঋণ শোধ করা— এটাই আমাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। আমাদের সবার সেবা করতে হবে; কিন্তু যেসব আত্মীয়ের জন্য আমরা দায়ী, তাদের সেবা আগে করতে হবে। নীতি হলো— দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, বিষয় ইত্যাদি আমাদের নয়— এবং সেগুলো আমাদের জন্যও নয়। তাই নিজ নিজ কর্তব্য পালন করলে পরস্পরের উন্নতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ঘটে। **কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:** একজন ব্যক্তি নিজের কর্তব্য পালন করার সময় অন্যের অধিকার রক্ষা করলেই কর্মযোগ ঘটে। যেমন— পিতামাতার সেবা করা পুত্রের কর্তব্য এবং পিতামাতার অধিকার। অন্যের অধিকারই আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের কর্তব্য পালন করে অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং অন্যের কর্তব্যের দিকে তাকানো চলবে না। অন্যের কর্তব্যের দিকে তাকালে ব্যক্তি নিজেই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়; কারণ অন্যের কর্তব্য দেখা আমাদের কর্তব্য নয়। ইঙ্গিত হচ্ছে— পরের মঙ্গল সাধন করা আমাদের কর্তব্য এবং তাদের অধিকার। অধিকার কর্তব্যের অধীনস্থ হলেও, তবু ব্যক্তির নিজের অধিকারের দিকে একেবারেই তাকানো উচিত নয়; বরং নিজের অধিকার ত্যাগ করা উচিত। অন্যের অধিকার রক্ষার জন্যই তাকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। অন্যের কর্তব্য দেখা ও নিজের অধিকার দাবি করা— এতে ইহলোক ও পরলোকে মহাপতন ঘটে। বর্তমান সময়ে গৃহে ও সমাজে যে অশান্তি, কলহ ও সংঘর্ষ দেখা যায়, তার মূল কারণই এই— লোকেরা নিজের অধিকার দাবি করে কিন্তু কর্তব্য পালন করে না! তাই ব্রহ্মা দেবতা ও মানুষকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, পরস্পরের মঙ্গল সাধন করাই তোমাদের কর্তব্য। ‘শ্রেয়ঃ পরম্ অবাপ্স্যথ’— সাধারণভাবে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, এখানে পরম শুভ লাভের কথা বলা অতিরঞ্জন, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এ বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকলে সে নিজে চেষ্টা করে দেখতে পারে। যেমন— আমানতের মালিককে আমানত ফেরত দিলে আমাদের সঙ্গে সেই মালিকের এবং সেই আমানতেরও কোনো সম্পর্ক থাকে না, তেমনই পার্থিব বস্তুকে জগতের সেবায় নিয়োগ করলে আমাদের সঙ্গে জগৎ ও জগতের বস্তুর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। জগতের সঙ্গে কল্পিত সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুদ্ধ চৈতন্যর অনুভূতি লাভ হয়। তাই প্রজাপতি ব্রহ্মার বাক্যে অতিরঞ্জন কল্পনা করা অনুচিত। নীতি হলো— যে ব্যক্তি নিজের জন্য কাজ করে, তার কর্মের শেষ হয় না এবং সে ক্রমশই কর্মে বদ্ধ হয়। যে ব্যক্তি নিজের জন্য কিছুই করে না, সেই কেবল তৃপ্ত হয়। নিজের জন্য কিছু না করলে পাপাচারও ঘটে না; কারণ পাপাচার ঘটে কেবল কামনা থেকেই (৩.৩৭)। তাই যে সাধক নিজের মঙ্গল কামনা করে, তাকে শাস্ত্রবিধি অনুসারে ফলকামনা ও আসক্তি ত্যাগ করে অবশ্যকর্তব্য পালনে যত্নবান হতে হবে; তবেই মঙ্গল স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সাধিত হয়। নিজের কামনা ত্যাগ করলে সমগ্র জগতের মঙ্গল হয়। যে ব্যক্তি আসক্ত হয়ে নিজের কামনা পূরণের জন্য সুখভোগ করে, সে কেবল নিজেরই ক্ষতি করে (নিজের পতন ঘটায়) না, সেই সঙ্গে সুখভোগের উপায়হীন ব্যক্তিদেরও ক্ষতি করে, অর্থাৎ তাদের দুঃখ দেয়। কারণ, সুখভোগের উপায়সম্পন্ন ব্যক্তিকে দেখে উপায়হীন ব্যক্তির পক্ষে সেই উপায়ের অভাবে দুঃখবোধ করা স্বাভাবিক। এভাবে নিজের জন্য সুখভোগকারী ব্যক্তি কখনোই হিংসা এড়াতে পারে না। এর ঠিক বিপরীত, আধ্যাত্মিক পথে চলা ব্যক্তিকে দেখলে অন্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শান্তি পায়, কারণ আধ্যাত্মিক সম্পদে সবার সমান অধিকার। উপসংহার হলো— যদি কোনো ব্যক্তি কামনা ও আসক্তি ত্যাগ করে নিজের অবশ্যকর্তব্য পালন করতে থাকে, তাহলে ব্রহ্মার বাক্য অনুসারে সে অবশ্যই পরম শুভ লাভ করবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে পরম শুভ লাভের কথা প্রধানত মানুষের জন্যই বলা হয়েছে, দেবতাদের জন্য নয়। কারণ দেবতাদের অবস্থান তাদের নিজেদের মুক্তি লাভের জন্য সৃষ্ট নয়। দেবতারা সৃষ্টি হয়েছে মানুষ যে কর্ম করে, তার ফল দান করার জন্য, কর্মের উপকরণ সরবরাহ করার জন্য এবং নিজেদের পুণ্যকর্মের ফল ভোগ করার জন্য। তারা নিষ্কামভাবে কর্মের উপকরণ সরবরাহ করে— এমন নয়। তবে কোনো দেবতা যদি নিজের মুক্তি কামনা করে, তাহলে তার মুক্তি লাভে কোনো নিষেধ নেই, অর্থাৎ কেউ মুক্তি লাভ করতে চাইলে পারে। যখন সবচেয়ে পাপী মানুষেরও মুক্তিতে কোনো নিষেধ নেই, তখন দেবতাদের (যারা পুণ্য জন্ম) মুক্তি লাভে নিষেধ কী করে থাকতে পারে? তবুও দেবতাদের লক্ষ্য থাকে ভোগ, তাই সাধারণত তাদের নিজেদের মুক্তির ইচ্ছা থাকে না।
★
↑