**ভগবদ্গীতা, অধ্যায় ৩, শ্লোক ১২-এর ভাষ্য বাংলায় অনুবাদ**
**শ্লোক:** ৩.১২: যজ্ঞভাবিতাঃ দেবাঃ তোমাদের প্রয়োজনীয় ভোগ (সাধন-সামগ্রী) দান করবেন। যে ব্যক্তি তাদের (দেবতাদের) প্রদত্ত সেই সামগ্রী অপরকে না দিয়ে কেবল নিজেই ভোগ করে, সে নিশ্চয়ই চোর।
**ভাষ্য:** "ইষ্টান ভোগান হি বো দেবা দাস্ত্যন্তে যজ্ঞ-ভাবিতাঃ" — এখানেও "ইষ্ট-ভোগ" শব্দের অর্থ কাম্য ভোগ্য বস্তু হতে পারে না। কারণ পূর্ব শ্লোক (একাদশ) পরম কল্যাণ লাভের কথা বলেছে, আর এই (দ্বাদশ) শ্লোকে তার উপায় নির্দেশ করা হয়েছে। ভোগের ইচ্ছা থাকতে পরম কল্যাণ লাভ কখনই সম্ভব নয়। তাই এখানে "ইষ্ট" শব্দটি "যজ্" ধাতু থেকে নিষ্পন্ন এবং "ভোগ" শব্দের অর্থ প্রয়োজনীয় সাধন-সামগ্রী — সুতরাং উক্ত শব্দগুলির অর্থ হল: সেই দেবতারা যজ্ঞ (কর্তব্যকর্ম) সম্পাদনের জন্য তোমাদের প্রয়োজনীয় সাধন-সামগ্রী সরবরাহ করতে থাকবেন।
"যজ্ঞ-ভাবিতাঃ দেবাঃ" বাক্যটি ইঙ্গিত করে যে, দেবতারা নিজেদের কর্তব্য মনে করে নিশ্চয়ই মানুষের প্রয়োজনীয় সাধন-সামগ্রী প্রদান করেন; কেবল মানুষেরই নিজ কর্তব্য পালন করা প্রয়োজন।
"তৈর্ দত্তান্ অপ্রদায় এভ্যো যো ভুঙক্তে" — প্রজাপতি ব্রহ্মা দেবতাদের জন্য "তে দেবাঃ" শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, কারণ তাঁর সম্মুখে মানুষ উপস্থিত ছিল, দেবতা নয়। কিন্তু এখানে "এভ্যঃ" ("ইদম্" শব্দ থেকে গঠিত) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা নৈকট্য নির্দেশ করে। প্রভুর কাছে সকলেই নিকটবর্তী (গীতা ৭.২৬)। এটি প্রমাণ করে যে এখান থেকে প্রভুর নিজস্ব বাক্য শুরু হয়েছে।
এখানে "ভুঙক্তে" শব্দের অর্থ কেবল আহার করা নয়, বরং দৈহিক পোষণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সাধন-সামগ্রী (খাদ্য, বস্ত্র, ধন, বাসস্থান ইত্যাদি) নিজের সুখের জন্য ব্যবহার করাকে বোঝায়।
এই দেহ পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত এবং তাদের দ্বারাই পোষিত হয়। জ্ঞান গুরুদের কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়। দেবতারা সকলকে কর্তব্যকর্মের সাধন-সামগ্রী প্রদান করেন। ঋষিরা সকলকে জ্ঞান দান করেন। পিতৃপুরুষেরা মানুষের সুখ ও সুবিধার উপায় দেখিয়ে দেন। পশু, পাখি, বৃক্ষ, লতা ইত্যাদি পরের সুখের জন্য নিজেদকে সমর্পণ করে। (যদিও পশু-পাখি প্রভৃতি জানে না যে তারা অন্যের উপকার করছে, তবুও তাদের মাধ্যমে অন্যের উপকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে।) এইভাবে, আমাদের যেসব সামর্থ্য — শক্তি, সামর্থ্য, পদ, কর্তৃত্ব, ধন, সম্পত্তি ইত্যাদি — রয়েছে, তার সবই অপরের কাছ থেকে প্রাপ্ত। তাই এগুলো কেবল অপরের সেবায় নিয়োগ করাই কর্তব্য।
দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ইত্যাদি — এই সমস্তই জগৎ থেকে প্রাপ্ত। এগুলো কখনই আমাদের নিজস্ব নয়, কখনও হবেও না। তাই এগুলোকে নিজের ও নিজের জন্য মনে করে, এদের মাধ্যমে সুখভোগ করা, এটাই বন্ধন। এই বন্ধন থেকে মুক্তির সহজ উপায় হল, যাদের কাছ থেকে এগুলো পেয়েছি, তাদেরই এগুলো মনে করে, নিঃস্বার্থভাবে তাদের সেবায় এগুলো নিয়োগ করা। এটাই আমাদের পরম কর্তব্য।
সাধকের মনে প্রায়ই একটি সন্দেহ জাগে: "যদি আমরা জগতের সেবা করি, তবে জগতের প্রতি আসক্ত হয়ে জড়িয়ে পড়ব!" কিন্তু প্রভুর বাক্য প্রতিষ্ঠা করে যে, জড়িয়ে পড়ার কারণ সেবা নয়, বরং কিছু গ্রহণ করে নিজের জন্য নেওয়ার ভাবনা। তাই গ্রহণের ভাবনা পরিত্যাগ করে, দেবতাদের মতো অপরকে সুখ দান করাই প্রতিটি মানুষের পরম কর্তব্য।
কর্মযোগের নীতি হল প্রাপ্ত সাধন-সামগ্রী, সামর্থ্য, সময় ও বুদ্ধির সদ্ব্যবহার। প্রাপ্ত সামগ্রীর অতিরিক্ত (নতুন সাধন-সামগ্রী ইত্যাদি) কামনা করা কর্মযোগের নীতির বিরুদ্ধ। তাই প্রাপ্ত সাধন-সামগ্রী ইত্যাদি অপরের মঙ্গলের জন্য নিয়োগ করতে হবে। অতিরিক্তের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। যার যতটুকু সামর্থ্য, তার কাছ থেকে ততটুকুই প্রত্যাশা করা যুক্তিসঙ্গত; তাহলে ঈশ্বর বা দেবতারা কীভাবে তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করতে পারেন?
"স্তেন এব সঃ" — এখানে একবচনের ব্যবহার ("সঃ স্তেনঃ") ইঙ্গিত করে যে, যে ব্যক্তি নিজ কর্তব্য পালন করে না, সে সকলের জন্য নির্দিষ্ট ভোগ্য সামগ্রীর (খাদ্য, জল, বস্ত্র ইত্যাদি) ভাগ অপরকে না দিয়ে কেবল নিজেই গ্রহণ করে। তাই সে নিশ্চয়ই চোর।
যে ব্যক্তি অপরকে তাদের ভাগ না দিয়ে কেবল নিজেই ভোগ করে, সে নিশ্চয়ই চোর। কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো পরিমাণে নিজের স্বার্থসিদ্ধি কামনা করে — অর্থাৎ সেবায় সাধন-সামগ্রী নিয়োগের বিনিময়ে সম্মান, প্রশংসা ইত্যাদি কামনা করে — সেও ততটুকু চোর। এমন ব্যক্তির হৃদয় কখনই পবিত্র ও শান্তিময় থাকতে পারে না।
এই ব্যক্তিগত দেহ কোনোভাবেই সমষ্টিগত জগৎ থেকে পৃথক নয়, হতে পারে না; কারণ সমষ্টির অংশই ব্যক্তি নামে পরিচিত। তাই ব্যক্তি (দেহ)কে নিজের বলে মনে করা এবং সমষ্টি (জগৎ)কে নিজের বলে না মনে করাই রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি দ্বৈতভাবের কারণ, এবং এটাই অহংকার, ব্যক্তিত্ব বা অসমতা। কর্মযোগের অভ্যাসে এই সমস্ত (রাগ, দ্বেষ ইত্যাদি) সহজেই বিনষ্ট হয়। কারণ কর্মযোগী এই ভাবনা বজায় রাখেন: "আমি যা কিছু করছি, তা নিজের জন্য নয়, সমগ্র জগতের জন্য করছি।" এখানে একটি গভীর তত্ত্ব নিহিত আছে: কর্মযোগী সমগ্র জগতের মঙ্গলকেই লক্ষ্য রেখে সমস্ত কর্ম সম্পাদন করেন, নিজের মঙ্গলের জন্য কোনো কর্মই করেন না। কারণ, নিজের মঙ্গলকে সকলের মঙ্গল থেকে পৃথক মনে করলেও ব্যক্তিত্ব ও অসমতার উদ্ভব হয়, যা সাধকের অগ্রগতিতে বাধা। আমাদের যা কিছু আছে — দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ইত্যাদি — তার সবই জগৎ থেকে প্রাপ্ত। জগৎ থেকে প্রাপ্ত বস্তু কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা সততা নয়।
**কর্তব্য সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশ:**
হিন্দু সংস্কৃতির একমাত্র লক্ষ্য হল মানবকল্যাণ। এই লক্ষ্য নিয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মা (সৃষ্টির শুরুতে) মানুষকে আদেশ দেন যে, তারা যেন পরস্পরের কর্তব্য নিঃস্বার্থভাবে পালন করে একে অপরকে সুখ দান করে (গীতা ৩.১০)।
একটি পরিবারে ভাই, বোন, মা ইত্যাদি সকলেই নিশ্চয় কর্ম করে; কিন্তু তারা যে মহাভুল করে তা হল, তারা কাম, আসক্তি, মোহ, স্বার্থপরতা ইত্যাদির বশে কর্ম করে। তাই তারা ইহলৌকিক বা পারলৌকিক কোনোটাই লাভ করে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বার্থপরতার বশে নিজের জন্য কর্ম করাই এই জগতে কলহ, বিবাদ, ঈর্ষা ইত্যাদি সৃষ্টি করে এবং পরজন্মে নিকৃষ্ট অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। অপরের সেবা করে এবং তার বিনিময়ে কিছু কামনা করলে, বস্তু ও ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক বন্ধনস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। যে কোনো কর্মের সাথে স্বার্থপরতা যুক্ত হলে সেই কর্মই ক্ষুদ্র ও বন্ধনকারী হয়ে পড়ে। স্বার্থপর ব্যক্তিকে জগতে কেউ ভালো বলে না। যে ব্যক্তি কামনা করে, তাকে বেশি দিতে কেউ ইচ্ছুক নয়। প্রায়শই দেখা যায়, ঘরেই আসক্ত ও ভোগলিপ্সু ব্যক্তির কাছ থেকে জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখা হয়। বিপরীতভাবে, যদি আমরা যতটুকু বুদ্ধি, সময়, সামর্থ্য ও সাধন-সামগ্রী আছে, তা দিয়ে অপরের সেবা করি, তবে তা নিশ্চয়ই মঙ্গলকর হয়। তাছাড়া, বস্তু, সুখ-সুবিধা, সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি কামনা না করলেও সেগুলি লাভ হতে শুরু করে। তবে একজন কর্মযোগীর সম্মান, প্রশংসা ইত্যাদির কোনো কামনা থাকে না, কারণ এগুলির কামনা ও সুখভোগ বন্ধনকারী। "আমি কীভাবে সুখ লাভ করব?" — কেবল এই কামনার কারণেই মানুষ কর্তব্যে অমনোযোগী হয়ে পতিত হয়। তাই "অপরেরা কীভাবে সুখ লাভ করবে?" — কর্মযোগীর মনে সর্বদা এই ভাবনা বজায় থাকা উচিত। ঘরের সমস্ত ব্যক্তি — পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান ইত্যাদি — একে অপরের মঙ্গল চিন্তা করবে।
যে ব্যক্তি সেবা করে, সে একটি সাধারণ ভুল করে — সে মিথ্যা অহংকার নিয়ে বসে থাকে, ভাবে "আমি সেবা করছি", "আমি জিনিস দিচ্ছি"। বাস্তবে, যে ব্যক্তি সেবা করে, সে সেবিতেরই বস্তু সেবিতকে দেয়। যেমন মায়ের দুধ নিজের জন্য নয়, কেবল সন্তানের জন্যই, তেমনই মানুষের যত সাধন-সামগ্রী আছে, তা নিজের জন্য নয়, কেবল অপরের জন্যই। তাই প্রাপ্ত সাধন-সামগ্রীর প্রতি আসক্তি বোধ করার — অর্থাৎ সেগুলিকে নিজের ও নিজের জন্য মনে করার — মানুষের কোনো অধিকার নেই। আসক্তি বোধ করলেও প্রাপ্ত সাধন-সামগ্রী সর্বদা থাকবে না; কেবল আসক্তিরূপ বন্ধনই থাকবে। এই কারণে প্রভু বলেছেন, যে ব্যক্তি বস্তুকে নিজের মনে করে নিজের জন্য ভোগ করে, সে নিশ্চয়ই চোর।
দেবতা, ঋষি, পিতৃপুরুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষ, লতা ইত্যাদির স্বভাবই হল পরোপকার। মানুষ, সর্বদা তাদের থেকে সহযোগিতা পেয়ে, তাদের কাছে ঋণী। এই ঋণ থেকে মুক্তির জন্যই পঞ্চমহাযজ্ঞ (ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ)ের বিধান দেওয়া হয়েছে। মানুষই একমাত্র এমন প্রাণী যে বুদ্ধিপূর্বক নিজের কর্তব্যকর্ম দ্বারা সকলকে তৃপ্ত করতে পারে। তাই মানুষের উপরেই সর্বাধিক দায়িত্ব ন্যস্ত। একমাত্র সে-ই এমন স্বাধীনতা পেয়েছে, যার সদ্ব্যবহার করে সে পরম কল্যাণ লাভ করতে পারে।
দেবতারা ইত্যাদি নিশ্চয়ই নিজ কর্তব্য পালন করে। মানুষ যদি নিজ কর্তব্য না পালন করে, তবে কেবল দেবতাদের মধ্যেই নয়, ত্রিভুবনে অশান্তি সৃষ্টি হয়, এবং ফলস্বরূপ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুরু হয়। প্রভুও বলেছেন (গীতা ৩.২৩-২৪) যে, যদি তিনি সতর্কভাবে নিজ কর্তব্য না পালন করেন, তবে সমস্ত লোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হত। যেমন চলন্ত গরুর গাড়ির একটি চাকা ভাঙলেও সমস্ত গাড়ি টলমল করে, তেমনই সৃষ্টির চলন্ত চক্রে যদি একজন ব্যক্তিও কর্তব্যে অমনোযোগী হয়, তবে তার প্রতিকূল প্রভাব সমগ্র সৃষ্টির উপর পড়ে। বিপরীতভাবে, যেমন দেহের একটি পীড়িত (রোগগ্রস্ত) অঙ্গ সুস্থ হলেও সমস্ত দেহ স্বতঃই উপকৃত হয়, তেমনই একজন ব্যক্তি যিনি সঠিকভাবে নিজ কর্তব্য পালন করেন, তার মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টি স্বতঃই উপকৃত হয়।
প্রজাপতি ব্রহ্মা দেবতা ও মানুষ উভয়কেই নিজ নিজ কর্তব্য পালনের আদেশ দিয়েছিলেন। দেবতারা ইত্যাদি সকলেই সীমার মধ্যে কাজ করে। কেবল মানুষই নিজের মূর্খতাবশত সীমা লঙ্ঘন করে। কারণ সে অপরের সেবার জন্য প্রাপ্ত সাধন-সামগ্রীকে নিজের সম্পত্তি মনে করে। অনন্ত পূর্বজন্মের কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি লাভের জন্য মানুষকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে কর্ম ও তার ফলাফলের প্রতি আসক্তি ও অধিকারবোধ তৈরি করে তা অপব্যবহার করে। ফলস্বরূপ, নতুন বন্ধন সৃষ্টি করে, নিজেই জড়িয়ে পড়ে এবং বহু ভবিষ্যৎ জন্মের জন্য দুঃখ ভোগের আয়োজন করে। তাই মানুষ যত সাধন-সামগ্রী পেয়েছে, তা দিয়ে ত্রিভুবনের সেবা করবে — অর্থাৎ ঈশ্বর, দেবতা, ঋষি, পিতৃপুরুষ, মানুষ — সমস্ত প্রাণীর সেবায় সেই সাধন-সামগ্রী নিয়োগ করবে।
**সন্দেহ:** যদি প্রাপ্ত সমস্ত সাধন-সামগ্রী অপরের সেবায় নিয়োগ করা হয়, তবে কর্মযোগীর জীবনধারণ কীভাবে চলবে?
**সমাধান:** প্রকৃতপক্ষে, এই সন্দেহ দেহের সাথে নিজেকে অভিন্ন মনে করা থেকে — অর্থাৎ দেহকে নিজের স্বরূপ মনে করা থেকে — উদ্ভূত হয়। কিন্তু কর্মযোগী দেহের সাথে কোনো সম্পর্কই মনে করেন না; বরং তিনি দেহকে জগতের ও জগতের জন্যই মনে করে, তার সেবায় নিয়োগ করেন। তাঁর দৃষ্টি থাকে অনশ্বর স্বরূপের উপর, নশ্বর দেহের উপর নয়। কেবল যার দৃষ্টি দেহের উপর, সেই কর্মযোগীর জীবনধারণ কীভাবে চলবে — এইরূপ সন্দেহ তুলতে পারে। যতদিন ভোগের ইচ্ছা থাকে, ততদিন বাঁচার ইচ্ছা ও মৃত্যুর ভয় থাকে। কর্মযোগীর মধ্যে ভোগের ইচ্ছা থাকে না, কারণ তাঁর সমস্ত কর্ম নিজের জন্য নয়, কেবল অপরের সেবার জন্যই। তাই কর্মযোগী নিজের জীবিকা নিয়ে চিন্তা করেন না। তাঁর মনে এই প্রশ্নই উঠে না: "আমার জীবিকা কীভাবে চলবে?" সত্যি বলতে, যার হৃদয়ে জগতের প্রয়োজন নেই, জগতের তার প্রয়োজন আছে। তাই জগৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার জীবিকার ব্যবস্থা করে।
যে সমস্ত সাধারণ প্রাণী — পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষ, লতা ইত্যাদি — যাদের জীবন পরোপকারে নিয়োজিত, তাদের জীবিকারও যদি ব্যবস্থা হয়, তবে যে মানুষ দেহসহ প্রাপ্ত সমস্ত সাধন-সামগ্রী প্রাণীমাত্রের মঙ্গলের জন্য ব্যয় করে, তার জীবিকার ব্যবস্থা না হওয়া কীভাবে সম্ভব?
সর্বপালক ঈশ্বরের অনন্ত কৃপায় সমস্ত প্রাণীর জীবিকার সাধন-সামগ্রী সমানভাবে প্রাপ্ত হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ সবার সামনেই আছে। মাতৃদেহে যেখানে কেবল রক্ত, সেখানেও সন্তানের পোষণের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিষ্টি ও পুষ্টিকর দুধ উৎপন্ন হয়। তাই ভাগ্যবশত বা ঈশ্বরের কৃপায়, মানুষের জীবিকার উপায় নিশ্চয়ই তার কাছে আসে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ, চিন্তা, দুঃখ বা উদ্বেগ থাকা উচিত নয়। প্রভুর রাজ্যে, যখন সবচেয়ে পাপী ও সবচেয়ে নাস্তিক মানুষেরও জীবিকা চলে, তখন কর্মযোগীর জীবিকায় কী বাধা থাকতে পারে? তাই এই প্রশ্ন তোলাই একটি ভুল।
**সংযোগ:** নবম শ্লোকে প্রভু, যজ্ঞার্থ সম্পাদিত কর্ম বন্ধনকারী নয় — এটি বলে যজ্ঞার্থ কর্ম করার আদেশ দিয়েছিলেন। ব্রহ্মার বাক্য দ্বারা সেই আদেশকে দৃঢ় করে, এবং নবম শ্লোতে উক্ত নিজের বাক্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, তিনি পরবর্তী শ্লোকগুলিতে যজ্ঞ (কর্তব্যকর্ম) সম্পাদন ও না করার ফল স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে অগ্রসর হচ্ছেন।
★🔗