**৩.২৮** কিন্তু, হে মহাবাহো, গুণবিভাগ ও কর্মবিভাগের তত্ত্বজ্ঞ মহাপুরুষ ‘গুণাই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে’ এইরূপ জানিয়া আসক্ত হন না।
**ভাষ্য:** এখানে ‘কিন্তু’ (তু) শব্দ দ্বারা পূর্বশ্লোকে বর্ণিত ‘অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা’ ব্যক্তির থেকে ‘তত্ত্ববিদ্’ মহাপুরুষকে পৃথক ও বৈপরীত্য দেখাইবার জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে। সত্ত্ব, রজ ও তম—এই তিন গুণ প্রকৃতি হইতে উৎপন্ন। এই তিন গুণের ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ায় সমগ্র সৃষ্টিই ত্রিগুণাত্মিকা। তাই দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, প্রাণী, বস্তু প্রভৃতি সমস্তই গুণমাত্র। ইহাকেই বলা হয় ‘গুণবিভাগ’। এগুলির (দেহাদির) দ্বারা সম্পাদিত কর্মসমূহকে বলা হয় ‘কর্মবিভাগ’।
গুণ ও কর্ম অর্থাৎ বস্তু ও ক্রিয়া নিরন্তর পরিবর্তনশীল। বস্তু উৎপত্তি-বিনাশের অধীন, কর্ম আরম্ভ-সমাপ্তির অধীন। ইহা সূক্ষ্মভাবে অনুভব করাই গুণ ও কর্মের বিভাগকে তত্ত্বতঃ জানা। চৈতন্য (আত্মা)তে কখনও ক্রিয়া সংঘটিত হয় না। উহা সদাই আসক্তিশূন্য ও অপরিবর্তনীয় থাকে, অর্থাৎ কোনও বস্তু বা ক্রিয়ার সহিত উহার কোনও সম্বন্ধই নাই। ইহা সূক্ষ্মভাবে অনুভব করাই চৈতন্যকে তত্ত্বতঃ জানা।
এই গুণবিভাগ ও কর্মবিভাগের সহিত যখন অজ্ঞ ব্যক্তি সম্বন্ধ আরোপ করে, তখন সে বদ্ধ হয়। শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এই বন্ধনের প্রধান কারণ ‘অবিদ্যা’, কিন্তু সাধকের দৃষ্টিতে ‘রাগ’ই প্রধান কারণ। রাগের উৎপত্তি ‘অবিবেক’ হইতে। বিবেক জাগ্রত হইলে রাগ বিনষ্ট হয়। এই বিবেক বিশেষভাবে মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। কেবল ইহাকে গুরুত্ব দিয়া জাগ্রত করিবারই প্রয়োজন। তাই সাধকের উচিত (বিবেক জাগ্রত করিয়া) বিশেষভাবে কেবল রাগেরই উচ্ছেদ সাধন করা।
তত্ত্ব জানিবার ইচ্ছুক সাধকও যদি গুণ (বস্তু) ও কর্ম (ক্রিয়া) সমূহের সহিত কোনও সম্বন্ধ আরোপ না করে, তবে সেও গুণ ও কর্মের বিভাগকে তত্ত্বতঃ জানিতে পারে। গুণ ও কর্মের বিভাগকে তত্ত্বতঃ জানুক, আর ‘আত্মা’কে (চৈতন্যস্বরূপকে) তত্ত্বতঃ জানুক—উভয়ের ফল একই হইবে।
**গুণবিভাগ ও কর্মবিভাগকে তত্ত্বতঃ জানিবার উপায়:**
১. দেহে অবস্থান করিয়াও চৈতন্যতত্ত্ব (আত্মা) সম্পূর্ণরূপে অকর্তা ও আসক্তিশূন্য থাকে (গীতা ১৩.৩১)। প্রকৃতির কার্য (দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি)কে ‘ইদম্’ বলা হয়। ‘ইদম্’ কখনও ‘অহম্’ হয় না। যখন ‘এইটি’ (দেহাদি) ‘আমি’ নহে, তখন ‘ইহার’ মধ্যে সংঘটিত কর্ম ‘আমার’ কিরূপে হইতে পারে? অর্থ এই যে, দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি সমস্তই প্রকৃতির কার্য, এবং ‘আত্মা’ ইহাদের সহিত সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন ও আসক্তিশূন্য। অতএব, ইহাদের মধ্যে সংঘটিত কর্মের কর্তা ‘আত্মা’ কিরূপে হইতে পারে? এইরূপে যিনি নিজেকে বস্তু ও ক্রিয়া হইতে পৃথক অনুভব করেন, তিনি বন্ধনে পতিত হন না। সর্বাবস্থায় ‘নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি’ (গীতা ৫.৮) — “আমি কিছুই করি না” — ইহা অনুভব করাই কর্ম হইতে নিজেকে পৃথক জানা অর্থাৎ অনুভব করা।
২. দেখা-শোনা, আহার-পান প্রভৃতি সমস্তই ‘কর্ম’, আর দেখা-শোনার বিষয়, আহার-পানের সামগ্রী প্রভৃতি সমস্তই ‘বস্তু’। আমরা ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, মুখ প্রভৃতি) দ্বারা এই কর্ম ও বস্তু জানি। আমরা ‘মন’ দ্বারা ইন্দ্রিয় জানি, ‘বুদ্ধি’ দ্বারা মন জানি, এবং কল্পিত ‘অহং’ দ্বারা বুদ্ধি জানি। এই ‘অহং’-ও এক সাধারণ জ্যোতি (চৈতন্য) দ্বারা প্রকাশিত হয়। সেই সাধারণ জ্যোতিই সমস্তের জ্ঞাতা, সমস্তের প্রকাশক ও সমস্তের আশ্রয়।
‘অহং’-এর পরেই নিজের স্বরূপ (চৈতন্য)কে কিরূপে জানা যায়? সুপ্তাবস্থায় বুদ্ধি অজ্ঞানে লীন হইলেও, জাগরণের পর ব্যক্তি বলে, “আমি খুব সুখে ঘুমাইয়াছি।” এইরূপে জাগরণের পর সকলেই ‘আমি আছি’ অনুভব করে। ইহা প্রমাণ করে যে, সুপ্তাবস্থায়ও নিজের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। যদি না থাকিত, তবে “আমি খুব সুখে ঘুমাইয়াছি; আমি কিছু জানি নাই” — এরূপ স্মৃতি বা জ্ঞান থাকিত না। স্মৃতি জন্মে অনুভব হইতে। তাই সকলেই প্রত্যেক অবস্থায় নিজের অস্তিত্বকে অবিচ্ছিন্নভাবে অনুভব করে। কোনও অবস্থাতেই নিজের অভাব (‘আমি নাই’—এর ভাব) অনুভব করে না। যাঁহারা কল্পিত ‘অহং’ হইতেও সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া নিজের স্বরূপ (‘আছি’ত্ব) উপলব্ধি করিয়াছেন, তাঁহাকেই ‘তত্ত্ববিদ্’ বলা হয়।
অপরিবর্তনীয় পরমাত্মার সহিত আমাদের এক স্বতঃসিদ্ধ, নিত্য সম্বন্ধ রহিয়াছে। পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সহিত আমাদের সম্বন্ধ বাস্তবিকই নাই; কেবল কল্পিত মাত্র। আমরা যদি চিন্তা দ্বারা প্রকৃতির সহিত এই কল্পিত সম্বন্ধ নাশ করি, তাহাকে বলে ‘জ্ঞানযোগ’; আর যদি পরহিতার্থে কর্ম করিতে করিতে সেই একই সম্বন্ধ নাশ করি, তাহাকে বলে ‘কর্মযোগ’। প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ ছিন্ন হইলেই ‘যোগ’ (পরমাত্মার সহিত নিত্য সম্বন্ধের অনুভূতি) ঘটে; নতুবা তাহা কেবল ‘জ্ঞান’ ও ‘কর্ম’ মাত্র। তাই প্রকৃতির সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া যিনি পরমাত্মার সহিত নিজের নিত্য সম্বন্ধকে চিনিতে পারেন, তিনিই ‘তত্ত্ববিদ্’।
**‘গুণাই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে’:** প্রকৃতির গুণ হইতে উৎপন্ন হওয়ায় দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতিকেও ‘গুণ’ বলা হয়, এবং সমস্ত কর্ম ইহাদের দ্বারাই সম্পাদিত হয়। অবিবেকবশতঃ অজ্ঞ ব্যক্তি এই গুণসমূহের সহিত সম্বন্ধ আরোপ করিয়া ইহাদের দ্বারা সম্পাদিত কর্মের কর্তা নিজেকে মনে করে। কিন্তু ‘আত্মা’তে (সাধারণ জ্যোতি—চৈতন্য) নিজের স্বতঃসিদ্ধ অবস্থার অনুভূতি জন্মিলে ‘আমি কর্তা’—এই ভাব একেবারেই উঠিতে পারে না।
একটি রেল ইঞ্জিন চলে, অর্থাৎ উহাতে ক্রিয়া আছে; কিন্তু টানিবার শক্তি আসে ইঞ্জিন ও চালকের সমবায় হইতে। সত্য বলিতে, টানিবার শক্তি কেবল ইঞ্জিনেরই, কিন্তু চালক দ্বারা পরিচালিত হইলেই উহা গন্তব্যে পৌঁছিতে পারে। কারণ, ইঞ্জিনের ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি নাই, তাই উহাকে এমন এক চালকের (মানুষের) প্রয়োজন, যাঁহার ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি আছে। কিন্তু মানুষের দেহরূপ ইঞ্জিন ও পরিচালনার জন্য ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি—উভয়ই আছে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি—এই চারিটি এক সাধারণ জ্যোতি (চৈতন্য) হইতে সত্তা ও চৈতন্য পাইয়া কর্ম করিবার সামর্থ্য লাভ করে। সাধারণ জ্যোতির (জ্ঞানের) প্রতিবিম্ব বুদ্ধিতে পড়ে, মন বুদ্ধির জ্ঞান গ্রহণ করে, ইন্দ্রিয় মনের জ্ঞান গ্রহণ করে, এবং তখন দেহরূপ ইঞ্জিন পরিচালিত হয়। বুদ্ধি, মন, ইন্দ্রিয়, দেহ—এই সমস্তই গুণ, আর ইহাদের প্রকাশক অর্থাৎ সত্তা ও চৈতন্য দানকারী ‘আত্মা’ এই গুণসমূহের সহিত সম্পর্কহীন ও আসক্তিশূন্য থাকে। তাই সত্য বলিতে, গুণাই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে।
মহাপুরুষদের আচরণ লোকেরা অনুসরণ করে। তাই ভগবান, জ্ঞানী মহাপুরুষের দ্বারা কিরূপে লোকসংগ্রহ সাধিত হয় তাহা বর্ণনা করিয়া বলিতেছেন যে, যেমন সেই মহাপুরুষ ‘গুণাই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে’ ইহা অনুভব করিয়া ইহাতে আসক্ত হন না, সেইরূপ সাধকেরও সেইরূপ চিন্তা করিয়া আসক্ত হইতে নাই।
**প্রকৃতি ও পুরুষের সম্বন্ধ বিষয়ে এক গভীর তত্ত্ব:**
সদৃশ বস্তুর মধ্যেই সর্বদা আকর্ষণ ঘটে; যেমন—কর্ণ শব্দের দিকে, ত্বক স্পর্শের দিকে, চক্ষু রূপের দিকে, জিহ্বা রসের দিকে, নাসিকা গন্ধের দিকে আকৃষ্ট হয়। এইরূপ পঞ্চ ইন্দ্রিয় কেবল স্বস্ব বিষয়ের দিকেই আকৃষ্ট হয়। এক ইন্দ্রিয় কখনও অন্য ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হয় না। অর্থ এক বস্তুর প্রতি অন্য বস্তুর আকর্ষণের মৌলিক কারণ উহাদের সজাতীয়তা।
আকর্ষণ, অনুরাগ ও অনুরাগ-সিদ্ধি কেবল সজাতীয়তাতেই ঘটে। অসজাতীয় বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ, অনুরাগ বা অনুরাগ-সিদ্ধি কোনোটিই নাই। তাই সজাতীয়তা হেতু আকর্ষণ, অনুরাগ ও অনুরাগ-সিদ্ধি কেবল ‘প্রকৃতি’তেই ঘটে; কিন্তু অসজাতীয় প্রকৃতি (জড়) হইতে পুরুষের (চৈতন্য) দিকে যে আকর্ষণ দেখা যায়, সেটিও বাস্তবিক প্রকৃতির এক অংশের প্রকৃতির অন্য অংশের প্রতি আকর্ষণ মাত্র। করণ ও ভোগের ক্রিয়া কেবল প্রকৃতিতেই, পুরুষে নহে। পুরুষ সদাই অপরিবর্তনীয়, নিত্য, অপরিবর্ত্য ও একরস থাকে।
ত্রয়োদশ অধ্যায়ের একত্রিংশ শ্লোকে ভগবান বলিয়াছেন যে, দেহে অবস্থান করিয়াও পুরুষ প্রকৃতপক্ষে কিছুই করে না ও লিপ্ত হয় না—‘শরীরস্থো ’পি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে’। প্রকৃতিতে অবস্থিত অর্থাৎ প্রকৃতির সহিত অভেদ জ্ঞান করায়ই পুরুষ সুখ-দুঃখের ভোক্তৃত্বে হেতু বলিয়া কথিত হয়—‘পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে’ (গীতা ১৩.২০) এবং ‘পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুঙক্তে প্রকৃতিজান্ গুণান্’ (গীতা ১৩.২১)। অর্থ সমস্ত ক্রিয়া, ক্রিয়াসিদ্ধি ও আকর্ষণ কেবল প্রকৃতিতেই ঘটিলেও, প্রকৃতির সহিত অভেদ জ্ঞান করায় পুরুষ ‘আমি সুখী’, ‘আমি দুঃখী’ মনে করিয়া ভোক্তৃত্বে হেতু হয়। কারণ, প্রকৃতি (জড়)তে সুখী বা দুঃখী হওয়ার অনুভূতি ঘটিতে পারে না, আর প্রকৃতি (জড়) ব্যতীত পুরুষ (চৈতন্য) একাকী সুখ-দুঃখের ভোক্তা হইতে পারে না।
পুরুষে প্রকৃতির পরিবর্তনরূপ ক্রিয়া বা বিকার নাই, কিন্তু সম্বন্ধ আরোপ বা অনারোপ করিবার সামর্থ্য অবশ্যই আছে। উহা প্রস্তরের ন্যায় জড় নহে; বরং চৈতন্যস্বরূপ। পুরুষের যদি সম্বন্ধ আরোপ বা অনারোপ করিবার সামর্থ্য না থাকিত, তবে উহা প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ কিরূপে আরোপ করিত? প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ আরোপ করিয়া প্রকৃতির ক্রিয়াকে কিরূপে নিজের মধ্যে আরোপ করিত? এবং কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বকে কিরূপে নিজের মধ্যে স্বীকার করিত? সম্বন্ধ আরোপ বা অনারোপ করা এক ‘ভাব’, ‘ক্রিয়া’ নহে।
পুরুষের সম্বন্ধ যুক্ত বা অযুক্ত করিবার সামর্থ্য আছে, কিন্তু ক্রিয়া করিবার সামর্থ্য নাই। ক্রিয়া করিবার সামর্থ্য কেবল সেইখানেই আছে, যেখানে পরিবর্তন (বিকৃতি) আছে। পুরুষের পরিবর্তনশীলতার স্বভাব নাই, অপরপক্ষে প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতার স্বভাব আছে, অর্থাৎ প্রকৃতিতে ক্রিয়াশীলতা স্বাভাবিক। তাই প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ যুক্ত করিলেই পুরুষ ক্রিয়াকে নিজের মধ্যে আরোপ করে—‘কর্তাহমিতি মন্যতে’ (গীতা ৩.২৭)।
পুরুষে কোনও পরিবর্তন ঘটে না; ইহা (পরিবর্তনের অঘটন) উহার কোনও অক্ষমতা বা ত্রুটি নহে; বরং ইহা উহার মহিমা। উহা সদাই একরস, একরূপ। পরিবর্তন কেবল উহার স্বভাবই নহে; যেমন বরফের উষ্ণ হওয়ার স্বভাব বা সামর্থ্য নাই। পরিবর্তনরূপ ক্রিয়ার ঘটনা প্রকৃতির স্বভাব, পুরুষের নহে। কিন্তু প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ না আরোপ করিবার পূর্ণ সামর্থ্য, শক্তি ও স্বাধীনতা উহার আছে; কারণ বাস্তবিকই প্রকৃতির সহিত উহার কোনও সম্বন্ধ আদৌ নাই।
পুরুষ যখন প্রকৃতির অংশ দেহকে নিজের স্বরূপ মনে করে, তখন প্রকৃতির সেই অংশে (সজাতীয় প্রকৃতিতে) আকর্ষণ, ক্রিয়া ও তাহার ফললাভ চলিতে থাকে। ইহাই এখানে ‘গুণা গুণেষু বর্তন্তে’ শব্দদ্বারা নির্দেশিত। গুণসমূহে নিজের অস্তিত্ব আরোপ করিয়া পুরুষ (চৈতন্য) সুখ-দুঃখ ভোগ করিতে থাকে। বাস্তবিক পক্ষে সুখ-দুঃখের পৃথক অস্তিত্ব নাই। তাই ভগবান গুণের সহিত কল্পিত সম্বন্ধ বিশেষভাবে ছেদন করিতে জোর দিতেছেন।
তত্ত্বের দৃষ্টিতে সম্বন্ধছেদ পূর্ব হইতেই (সর্বদাই) রহিয়াছে। কেবল ভ্রমেই সম্বন্ধ আরোপ করা হইয়াছে। তাই কল্পিত সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিয়া কেবল “গুণাই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে” এই সত্যটিকেই চিনিতে হইবে।
**‘ইতি মত্বা ন সজ্জতে’**— এখানে ‘মত্বা’ শব্দ ‘জানিয়া’ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। তত্ত্ববিদ্ মহাপুরুষ প্রকৃতি (জড়) ও পুরুষ (চৈতন্য)কে স্বভাবতঃ পৃথক জানেন। তাই তিনি প্রকৃতিজাত গুণসমূহে আসক্ত হন না। ‘মত্বা’ শব্দ ব্যবহার করিয়া ভগবান যেন সাধকদিগকেও উপদেশ দিতেছেন যে, তাঁহারাও প্রকৃতিজাত গুণসমূহকে পৃথক মনে করিয়া ইহাতে আসক্ত হইবেন না।
**একটি বিশেষ তত্ত্ব:**
কর্মযোগী ও সাংখ্যযোগীর সাধনপদ্ধতিতে ঐক্য নাই। কর্মযোগী গুণের (দেহাদির) সহিত কল্পিত অভেদ নাশ করিতে চেষ্টা করে, তাই শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হইয়াছে—‘কর্মযোগস্তু কামিনাম্’ (১১.২০.৭)। এই কারণে ভগবানও কর্মযোগীর পক্ষে কর্ম করিবার আবশ্যকতা বিশেষভাবে নির্দেশ করিয়াছেন; যেমন—‘ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্যং পুরুষো ’শ্নুতে’ (গীতা ৩.৪); ‘যोगারূঢ়স্য তস্যৈব শমঃ কারণমুচ্যতে’ (গীতা ৬.৩)। কর্মযোগী কর্ম করে, কিন্তু নিজের জন্য করে না; বরং কেবল পরহিতের জন্যই করে; তাই সে সেই কর্মের ভোক্তা হয় না। ভোক্তা না হওয়ায় অর্থাৎ ভোক্তৃত্ব নাশ করায় কর্তৃত্ব আপনাআপনি নাশ পায়। অর্থ কর্তৃত্বের মধ্যে কর্তৃত্ব কেবল ফলকামনার জন্যই। যখন ফলকামনা নাই, তখন কর্তৃত্ব থাকে না। তাই বাস্তবিক কর্মযোগীও কর্তা হয় না।
সাংখ্যযোগীর মধ্যে বিবেক-চিন্তা প্রধান। ‘প্রকৃতিজাত গুণই গুণের সহিত ক্রিয়া করিতেছে’ জানিয়া তিনি সেই কর্মের কর্তা নিজেকে মনে করেন না। ভগবান ত্রয়োদশ অধ্যায়ের উনত্রিংশ শ্লোকে এই কথাই বলিবেন: “যিনি দেখেন যে সমস্ত কর্ম সর্বপ্রকারে কেবল প্রকৃতিই করিতেছে এবং ‘আত্মা’কে অকর্তা বলিয়া দেখেন, তিনিই যথার্থ দেখেন।” এইরূপে সাংখ্যযোগী কর্তৃত্ব নাশ করেন। কর্তৃত্ব নাশ হইলে ভোক্তৃত্ব আপনাআপনি নাশ পায়।
তৃতীয় অধ্যায়ের আদি হইতেই ভগবান বহু দৃষ্টান্ত ও দৃষ্টিকোণ দ্বারা কর্ম করিতে জোর দিয়াছেন; যেমন—জনকপ্রমুখ মহাপুরুষেরাও নিষ্কামভাবে কর্ম করিয়াই পরম সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন (৩.২০); ‘অহমপি’ কর্ম করি (৩.২২); ‘জ্ঞানী মহাপুরুষও লোকসংগ্রহের জন্য অজ্ঞের ন্যায় কর্ম করেন’ (৩.২৫-২৬)। ইহা প্রমাণ করে যে, সর্বদিক দিয়াই কেবল কর্ম করাই মঙ্গলজনক।
★🔗