৩.৩২। কিন্তু যারা আমার এই উপদেশে দোষারোপ করে এবং অনুসারে কার্য্য করে না, তারা সর্ব্বজ্ঞানে মোহিত, বিবেকবর্জ্জিত এবং নষ্ট বলিয়া জানিবে।
ভাষ্য: 'কিন্তু' শব্দটি এখানে ত্রিংশ শ্লোকে বর্ণিত সেই নীতির অনুসরণকারীদের জন্য একত্রিশ শ্লোকে যে কল্যাণ বর্ণনা করা হয়েছে, তার পর, সেই নীতির অনুসরণ না করা লোকদের পৃথক করবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন জগতের সকল স্বার্থপর লোকই কামনা করে যে, সমস্ত বস্তু কেবল তারই প্রাপ্য হোক এবং লাভও কেবল তারই হয়, তেমনই এই মনে করা যে, ঈশ্বর কামনা করেন যে সমস্ত কর্ম কেবল তাঁরই উদ্দেশ্যে অর্পিত হোক এবং তিনিই একমাত্র প্রভু রূপে গৃহীত হন—এটা ঈশ্বরের প্রতি দোষারোপ করা। "কামনা ছাড়া সংসারের কাজ কীভাবে চলবে? আসক্তি থেকে সম্পূর্ণ নিবৃত্তি অসম্ভব; রাগ-দ্বেষের মতো বাসনাগুলি থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব"—এইরূপ চিন্তা করা ঈশ্বরের 'উপদেশের' প্রতি দোষারোপ করা। যে সকল মানুষ ভোগ ও সঞ্চয়ের ইচ্ছুক, যারা দেহাদি বস্তুকে নিজের ও নিজের জন্য বলে মনে করে এবং সমস্ত কর্ম কেবল নিজের জন্যই সম্পাদন করে, তারা ঈশ্বরের উপদেশ অনুসারে কার্য্য করে না।
'সর্ব্বজ্ঞানে মোহিত'—যারা ঈশ্বরের উপদেশ পালন করে না, তারা নানাবিধ পার্থিব জ্ঞান (বিজ্ঞান, শিল্পকলা ইত্যাদি) নিয়ে মোহিত থাকে। তারা মোটর গাড়ি, এরোপ্লেন, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি আবিষ্কার, তাদের দক্ষতা ও কারুকার্য জানা এবং নতুন নতুন আবিষ্কার করতেই মগ্ন থাকে। তারা জলপথে চলাচল, গৃহনির্মাণ, চিত্রকলা ইত্যাদি শিল্প ও কারুশিল্পে; মন্ত্র, তন্ত্র, যন্ত্র ইত্যাদির জ্ঞানার্জনে এবং সেগুলির দ্বারা নানা অদ্ভুত কাণ্ড প্রদর্শনে; বিভিন্ন দেশের ভাষা, লিপি, রীতিনীতি, খাদ্য-পানীয় ইত্যাদির জ্ঞানার্জনে নিযুক্ত থাকে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, যা কিছু আছে তা কেবল এইই (গীতা ১৬.১১)। এমন ব্যক্তিদেরই এখানে সর্ব্বজ্ঞানে মোহিত বলা হয়েছে।
'বিবেকবর্জ্জিত'—যে সকল মানুষ ঈশ্বরের উপদেশ পালন করে না, তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বিষয়ে, যথা—সত্য ও অসত্য, সার ও অসার, ধর্ম ও অধর্ম, বন্ধন ও মোক্ষ ইত্যাদির কোন জ্ঞান (বিবেক) থাকে না। তাদের চেতনা নেই; তারা পশুর মতো অচেতন থাকে। তারা বৃথা আশা, বৃথা কর্ম ও বৃথা জ্ঞানবিশিষ্ট, চঞ্চলচিত্ত নির্বোধ ব্যক্তি—'মূঢ়া মনােষাং মতয়ো ভ্রান্তা:' (গীতা ৯.১২)।
'নষ্ট বলিয়া জানিবে'—মানুষের দেহ লাভ করেও যারা ঈশ্বরের উপদেশ অনুসারে কার্য্য করে না, তাদের নষ্ট বলেই মনে করতে হবে। ইঙ্গিত এই যে, তারা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধই থাকবে।
মানুষের জীবনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও মোক্ষলাভের সম্ভাবনা থাকে (গীতা ৮.৫)। তাই যারা বর্তমানে ঈশ্বরের উপদেশ পালন করে না, তারা ভবিষ্যতে সাধুসঙ্গ প্রভৃতির প্রভাবে তা পালন করতে পারে, যার দ্বারা তারা মোক্ষলাভ করতে পারে। কিন্তু যদি সেই মানুষের ভবিষ্যতের প্রকৃতি বর্তমানের মতোই থাকে, তবে তাদের নষ্ট বলেই মনে করতে হবে (ঈশ্বরপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবার কারণে)। এই জন্যই ঈশ্বর এমন ব্যক্তিদের জন্য 'নষ্ট বলিয়া জানিবে' শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন।
যে মানুষ ঈশ্বরের উপদেশ পালন করে না, সে সমস্ত কর্ম আসক্তি বা বিরাগ সহকারেই করে। আসক্তি ও বিরাগ উভয়েই মানুষের মহাশত্রু—'এতে দ্বে মহাব্ঘৌ' (গীতা ৩.৩৪)। বস্তু ও কর্ম নশ্বর বলে চিরকাল থাকে না, কিন্তু আসক্তি ও বিরাগ সহকারে কর্ম করলে মানুষ অভিমান, মমতা ও কামনায় বদ্ধ হয়ে বারবার নীচ যোনি ও নরক প্রাপ্ত হয়। সেই জন্যই ঈশ্বর এমন লোকদের নষ্ট বলেই মনে করতে বলেছেন।
একত্রিশ ও দ্বাত্রিংশ উভয় শ্লোকেই ঈশ্বর বলেছেন যে, যারা তাঁর নীতি পালন করে, তারা কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়, আর যারা তা পালন করে না, তাদের পতন হয়। ইঙ্গিত এই যে, মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে কি না, ঈশ্বরের সেই বিষয়ে কোন জিদ নেই; কিন্তু তাকে অবশ্যই ঈশ্বরের উপদেশ (নীতি) পালন করতে হবে—এটাই ঈশ্বরের আদেশ। যদি সে তা না করে, তবে তার পতন নিশ্চিত। তবে যদি কোন সাধক ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে তাঁর উপদেশের সাধন করে, তবে ঈশ্বর তাকে নিজেকে দান করবেন। কিন্তু যদি ঈশ্বরে অবিশ্বাস করেও কেবলমাত্র তাঁর উপদেশের সাধন করে, তবে ঈশ্বর তাকে মুক্তি দেবেন। ইঙ্গিত এই যে, ঈশ্বরে বিশ্বাসী ব্যক্তি 'প্রেম' লাভ করে, আর ঈশ্বরের উপদেশ পালনকারী ব্যক্তি 'মোক্ষ' লাভ করে।
সংশ্লেষ: মানুষ কেন ঈশ্বরের উপদেশ অনুসারে না চললে পতন হয়? এর উত্তর ঈশ্বর পরবর্তী শ্লোকে দিচ্ছেন।
★🔗