**৩.৩৫** স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ।
অর্থাৎ, গুণহীন হলেও স্বধর্ম পালন করা পরধর্ম সুচারুরূপে পালন করার চেয়ে শ্রেয়। স্বধর্মে মৃত্যুবরণও মঙ্গলজনক; পরধর্ম ভয়াবহ।
**ভাষ্য:** শ্লোকের অর্থ: 'গুণহীন হলেও স্বধর্ম, পরধর্ম সুন্দরভাবে পালন করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।' অন্যের বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদি সম্পর্কিত কর্তব্য (পরধর্ম) গুণসম্পন্ন, পালনে সহজ, মনে আকর্ষণ জন্মায়, ধন-ঐশ্বর্য-সুখ-সম্মান ইত্যাদি লাভ হয়, আরাম-আয়েশে জীবন কাটে—এমন মনে হলেও, তা নিজের জন্য বিহিত নয় বলে সেই পরধর্মে আসক্তি দুঃখদায়ক ফল বয়ে আনে। পক্ষান্তরে, নিজের বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদি সম্পর্কিত কর্তব্য (স্বধর্ম) গুণহীন, পালনে কঠিন, মনে অনিচ্ছা, ধন-ঐশ্বর্য-সুখ-সম্মান ইত্যাদি লাভ হয় না, সারাজীবন কষ্ট ভোগ করে তা পালন করতে হয়—এমন মনে হলেও, নিষ্কামভাবে সেই স্বধর্ম পালন করলে মঙ্গলজনক ফল লাভ হয়। তাই কোনো অবস্থাতেই নিজের ধর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়; বরং নিষ্কাম, নিঃস্বার্থ ও আসক্তিহীন ভাবে স্বধর্ম পালন করা উচিত।
মানুষের পক্ষে স্বধর্ম পালন স্বাভাবিক ও সহজসাধ্য। মানুষের 'জন্ম' হয় পূর্বকর্ম অনুসারে, আর জন্ম অনুসারে প্রভু 'কর্ম' বিধান করেছেন (গীতা ১৮.৪১)। তাই নিজের বিহিত কর্তব্য পালন করে মানুষ কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়, অর্থাৎ তার কল্যাণ সাধিত হয় (গীতা ১৮.৪৫)। তাই তা দোষযুক্ত মনে হলেও বিহিত কর্তব্য অর্থাৎ স্বধর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় (গীতা ১৮.৪৮)।
অর্জুন ভাবেন, যুদ্ধ না করে ভিক্ষান্নে জীবন ধারণ করাই ভাল (গীতা ২.৫)। কিন্তু এখানে প্রভু যেন অর্জুনকে বুঝাচ্ছেন যে, ভিক্ষান্নে জীবন ধারণ সংন্যাসীর স্বধর্ম হলেও, তোমার পক্ষে তা পরধর্ম; কারণ তুমি গৃহস্থ ক্ষত্রিয়, সংন্যাসী নও। প্রথম অধ্যায়েও অর্জুন যখন বলেন যে যুদ্ধ করলে কেবল পাপই হবে—'পাপমেবাশ্রয়েত্' (১.৩৬), তখন প্রভু বলেন যে ধর্মযুদ্ধ না করলে তোমার স্বধর্ম ও কীর্তি নষ্ট হবে এবং পাপভাগী হবে (২.৩৩)। তারপর প্রভু ব্যাখ্যা করেন যে যুদ্ধ করে জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখকে সমান জ্ঞান করে—অর্থাৎ রাগ-দ্বেষবর্জিত হয়ে নিজ কর্তব্য (স্বধর্ম) পালন করলে—কোনো পাপ স্পর্শ করে না (২.৩৮)। পরে অষ্টাদশ অধ্যায়ে প্রভু আরও বলেন যে, মানুষ স্বভাবসিদ্ধ স্বধর্মকর্ম করলে পাপ লাভ করে না (১৮.৪৭)। সারকথা, রাগ-দ্বেষ থাকলেই কেবল স্বধর্ম পালনে পাপ হয়, নতুবা হয় না। রাগ-দ্বেষশূন্য হয়ে স্বধর্ম সম্পূর্ণরূপে পালন করলে 'সমত্ব' (যোগ) লাভ হয়, আর সমত্ব লাভ হলে দুঃখ বিনষ্ট হয় (গীতা ৬.২৩)। তাই প্রভু অর্জুনকে বারবার উপদেশ দিচ্ছেন রাগ-দ্বেষ ত্যাগ করে যুদ্ধরূপ কর্তব্য, তার স্বধর্ম, পালন করতে।
প্রভু যেন অর্জুনকে বুঝাচ্ছেন যে, ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করায় ক্ষত্রিয়ধর্মের অন্তর্গত যুদ্ধ করাই তোমার স্বধর্ম (কর্তব্য); তাই যুদ্ধে জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখ সমান দৃষ্টিতে দেখবে; এবং বুঝবে যে যুদ্ধক্রিয়া আত্মার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই—এইভাবে কেবল কর্মাসক্তি দূর করার জন্যই কর্ম কর। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, বিষয় ইত্যাদি কেবল নিজ কর্তব্য পালনের জন্য।
বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদি অনুসারে নিজ কর্তব্য নিঃস্বার্থভাবে পালন করাই 'স্বধর্ম'। শাস্ত্রে যাকে 'ধর্ম' বলে, কর্তব্যও তাই। স্বধর্ম পালন বা নিজ কর্তব্য পালন একই কথা।
যা সহজে পালন করা যায়, যা অবশ্য পালনীয়, এবং যা পালন করলে অভীষ্ট নিশ্চিত লাভ হয়, তাকেই কর্তব্য বলে। ধর্ম পালন কর্তব্য বলে সহজ। নিজ ধর্মই যথাযথ পালন করলে মানুষের বৈরাগ্য লাভ হয়—'ধর্ম তেঁ বিরতি'... (মানস ৩.১৬.১)। ধর্মকে কর্তব্যজ্ঞান করে পালন করলে কর্মপ্রবাহ প্রকৃতিতে লীন হয়, এবং এভাবে কর্মসংসর্গ বন্ধ হয়।
বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদি অনুসারে প্রত্যেকের নিজ কর্তব্য (স্বধর্ম) কল্যাণপ্রদ। কিন্তু অন্যের বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদির কর্তব্যের তুলনায় নিজ কর্তব্য গুণের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ন্যূন মনে হতে পারে; যেমন ব্রাহ্মণের কর্তব্য (শম, দম, তপ, ক্ষমা ইত্যাদি) এর তুলনায় ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য (যুদ্ধ ইত্যাদি) অহিংসার মতো গুণে ন্যূন মনে হতে পারে। তাই এখানে 'বিগুণঃ' শব্দের উদ্দেশ্য হল, অন্যের কর্তব্যের তুলনায় নিজ কর্তব্য গুণহীন মনে হলেও, কেবল নিজ কর্তব্যই কল্যাণপ্রদ। তাই কোনো অবস্থাতেই নিজ কর্তব্য ত্যাগ করা উচিত নয়।
বর্ণ, আশ্রম ইত্যাদি অনুসারে কর্ম বাহ্যিকভাবে বিভিন্ন (ভয়ঙ্কর বা কোমল) মনে হতে পারে, কিন্তু পরমাত্মপ্রাপ্তির লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। কেবল যখন পরমাত্মপ্রাপ্তির লক্ষ্য অনুপস্থিত থাকে এবং যখন হৃদয়ে স্বাভাবিক বিষয়ের গুরুত্ব থাকে, তখনই কর্ম ভয়ঙ্কর বা কোমল মনে হয়।
'স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ'—স্বধর্ম পালন করলে যদি সর্বদা সুখ, আরাম, ধন-সম্পদ, মান-সম্মান ইত্যাদি লাভ হত, তবে বর্তমানে আমরা ধার্মিকদের দল দেখতাম। কিন্তু স্বধর্ম সুখ-দুঃখ দেখে পালন করা হয় না; বরং নিষ্কামভাবে, প্রভুর বা শাস্ত্রের আদেশ দেখে পালন করা হয়। তাই স্বধর্ম পালন করতে গিয়ে যদি কোনো কষ্ট আসে, অর্থাৎ নিজ কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যদি কষ্ট আসে, সেই কষ্টও উদ্ধারের কারণ হয়। সত্যি বলতে, তা কষ্ট নয়, তপস্যা। সেই কষ্টের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত তপস্যার চেয়েও দ্রুত অগ্রগতি হয়। কারণ, তপস্যা নিজের জন্য করা হয়, আর কর্তব্য পরের জন্য। ইচ্ছাকৃত তপস্যা যত ফল দেয় না, স্বধর্ম পালনের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসা কষ্টরূপ তপস্যা তত বেশি ফল দেয়। যারা স্বধর্ম পালনে কষ্ট সহ্য করেছেন এবং যারা স্বধর্ম পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তারাই অমর ধার্মিক হয়েছেন। জাগতিক দৃষ্টিতেও, ধর্ম (কর্তব্য) পালন করতে গিয়ে কষ্ট এলে যিনি অটল থাকেন, তিনি অত্যন্ত প্রশংসা ও গৌরব লাভ করেন। যেমন, দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে যারা কষ্ট ভোগ করেছেন, বারবার জেল খেটেছেন, ফাঁসিতে ঝুলেছেন, তারা আজও অত্যন্ত প্রশংসা ও গৌরব লাভ করছেন। পক্ষান্তরে, দুষ্কর্ম করে যারা জেলে যায়, তারা সর্বত্র নিন্দিত। সারকথা, নিজ ধর্ম নিষ্কামভাবে পালন করতে গিয়ে কষ্ট আসুক বা মৃত্যুই ঘটুক, তা ইহলোকে প্রশংসা ও পরলোকে কল্যাণের কারণ হয়।
স্বধর্ম পালনকারী ব্যক্তি ধর্মের দিকে দৃষ্টি রাখেন। ধর্মের দিকে দৃষ্টি রাখলে তার ধর্মের সাথে সংসর্গ বজায় থাকে। তাই ধর্ম পালন করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটলেও তার মুক্তি লাভ হয়।
**সন্দেহ:** স্বধর্ম পালন করতে গিয়ে মৃত্যু হলে কল্যাণ লাভ হয়—এ কথা আমরা কীভাবে মানব?
**সমাধান:** গীতা স্বয়ং ভগবানের বাক্য; তাই এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। দ্বিতীয়ত, এ বিষয় ইন্দ্রিয়চক্ষুর প্রত্যক্ষের বিষয় নয়, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের বিষয়। তবুও এ বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা হচ্ছে:
১. আমরা যার বিষয়ে অবহিত নই, কেবল শাস্ত্রের মাধ্যমেই তা জানি। শাস্ত্র বলে, ধর্ম তার রক্ষককে রক্ষা করে—'ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ' (মনুস্মৃতি ৮.১৫)। তাই ধর্ম পালনকারীর কল্যাণের দায়িত্ব ধর্মের ওপর এবং ধর্মের উপদেশদাতা ভগবান, বেদ, শাস্ত্র, ঋষি ইত্যাদির ওপর ন্যস্ত, এবং তাদের শক্তিতেই তার কল্যাণ সাধিত হয়। যেমন আমাদের শাস্ত্রে আছে, পতিব্রতা ধর্ম পালনকারিনী নারীর কল্যাণ হয়, সেখানে পতিব্রতা ধর্মের বিধানদাতা ভগবান, বেদ, শাস্ত্র ইত্যাদির শক্তিতে কল্যাণ হয়, স্বামীর শক্তিতে নয়। তেমনই, যেহেতু ধর্ম পালনের আদেশ ভগবান, বেদ, শাস্ত্র, ঋষি, সাধুদের, তাই ধর্ম পালন করতে গিয়ে মৃত্যু হলে তাদের শক্তিতে কল্যাণ লাভ হয়—এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
২. পুরাণ ও ইতিহাস থেকেও এটা প্রমাণিত যে, নিজ ধর্মের পালনকারী কল্যাণ লাভ করেন। যেমন, রাজা হরিশচন্দ্র অনেক কষ্ট, নিন্দা-অপমান ইত্যাদি সত্ত্বেও নিজ 'সত্য'-ধর্ম থেকে বিচলিত হননি; তাই তার প্রভাবে তিনি সমস্ত প্রজাসহ পরম ধামে গমন করেন এবং আজও তিনি অত্যন্ত প্রশংসা ও গৌরব লাভ করেন।
৩. বর্তমান সময়ে পুনর্জন্ম সম্পর্কিত অনেক সত্য ঘটনা দেখা, শোনা ও পড়া যায়, যার থেকে মৃত্যুর পর ভাল বা মন্দ অবস্থার কথা জানা যায়।
৪. নিজ কর্তব্য নিঃস্বার্থভাবে যথাযথ পালন করলে, বিশ্বাসী তো বটেই, এমনকি পরলোকে অবিশ্বাসী নাস্তিকও হৃদয়ে সাত্ত্বিক আনন্দ অনুভব করে। এই আনন্দ কল্যাণের সূচক; কারণ কল্যাণের স্বরূপ 'পরম শান্তি'। তাই নিজ অভিজ্ঞতা থেকেও এটা প্রমাণিত যে, অকর্তব্য সম্পূর্ণ ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করলে কল্যাণ লাভ হয়।
**মূল সূত্র:** পরমাত্মার অংশ হওয়ায়, সত্যিকার অর্থে স্বধর্ম হল: নিজের মঙ্গল করা, নিজেকে প্রভুর বলে মনে করা, প্রভু ছাড়া কাউকে নিজের বলে না মনে করা, নিজেকে সেবক বলে মনে করা, নিজেকে সাধক বলে মনে করা। কারণ এগুলোই সত্য ধর্ম, বিশেষভাবে নিজের ধর্ম, মন-বুদ্ধির ধর্ম নয়। বর্ণ, আশ্রম, দেহ ইত্যাদি সম্পর্কিত অন্যান্য সব ধর্ম, কর্তব্য পালনের জন্য স্বধর্ম হলেও, পরধর্ম। কারণ সেই সব ধর্ম অঙ্গীকারকৃত এবং নিজের নয়। সেই সব ধর্ম অন্যের সাহায্য চায়, অর্থাৎ তারা পরতন্ত্র, কিন্তু নিজের সত্য ধর্ম কারও সাহায্য চায় না, অর্থাৎ তা স্বতন্ত্র। তাই যিনি প্রেমিক, তিনি স্বয়ং; যিনি সাধক, তিনি স্বয়ং; যিনি সেবক, তিনি স্বয়ং। এইভাবে প্রেমিক প্রেমস্বরূপ হয়ে প্রিয়তমের সাথে একাত্ম হন, সাধক সাধনস্বরূপ হয়ে জ্ঞেয় সত্যের সাথে একাত্ম হন, সেবক সেবাস্বরূপ হয়ে সেব্যের সাথে একাত্ম হন। তেমনই সাধক সাধনস্বরূপ হয়ে সাধ্যের সাথে একাত্ম হন।
ঈশ্বরপ্রাপ্তিকামী সাধকের ধন, মান, প্রশংসা, সম্মান, আরাম ইত্যাদির কোনো কামনা থাকে না। তাই ধন, মান ইত্যাদি না পেলে তাদের কোনো উদ্বেগ হয় না, আর ভাগ্যবশত পেলে কোনো আনন্দও হয় না। কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল পরমাত্মপ্রাপ্তি, ধন-মানপ্রাপ্তি নয়। তাই কর্তব্যরূপে প্রাপ্ত জাগতিক কাজও তারা সুচারুরূপে ও নির্মলভাবে সম্পাদন করেন। ঈশ্বরপ্রাপ্তি লক্ষ্য রাখায় তাদের সব কাজ কেবল প্রভুর জন্য হয়। যেমন, ধনলাভ লক্ষ্য রেখে বণিক আরাম ত্যাগ করে কষ্ট সহ্য করে, এবং যেমন রুগীর হৃদয় এই চিন্তায় আনন্দিত থাকে যে 'ডাক্তারের এই কাটাছেঁড়ার ফল ভাল হবে', তেমনই ঈশ্বরপ্রাপ্তি লক্ষ্য রেখে জগতে পরাজয়, ক্ষতি, কষ্ট ইত্যাদি পেলেও সাধকের হৃদয় স্বভাবতই আনন্দিত থাকে। অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি তাদের পক্ষে কেবল উপায় ও উপকরণ।
যে সাধক কেবল নিজের মঙ্গল করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে স্বধর্ম (স্বভাবসিদ্ধ কর্ম) পালনে তৎপর হন, তখন কোনো কষ্ট, দুঃখ, বিপদ ইত্যাদি এলে তিনি স্বধর্ম থেকে বিচলিত হন না। শুধু তাই নয়, সেই কষ্ট, দুঃখ ইত্যাদি তার পক্ষে তপস্যার রূপ ধারণ করে এবং আনন্দদায়ক হয়।
জগতে রাগ-দ্বেষ কেবল দেহকে 'আমি' ও 'আমার' বলে মনে করলেই জন্মায়। রাগ-দ্বেষ থাকলে মানুষ স্বধর্ম ও পরধর্ম জানে না। দেহ যদি 'আমি' (আত্মা) হত, তবে 'আমি' থাকতে দেহও থাকত, আর দেহ না থাকলে 'আমি'ও থাকত না। দেহ যদি 'আমার' হত, তবে তা পেলে আর কিছু পেতে ইচ্ছা থাকত না। ইচ্ছা থাকলে প্রমাণ হয় যে, সত্যি বলতে 'আমার' (নিজের) বস্তু এখনও পাওয়া যায়নি, আর প্রাপ্ত বস্তু (দেহ ইত্যাদি) 'আমার' নয়। দেহ আমাদের সাথে আনা হয়নি, সাথে নিয়ে যাওয়া যায় না, ইচ্ছামতো বদলানো যায় না, তবে তা 'আমার' হল কী করে?
এইভাবে 'দেহ আমি নই এবং আমার নয়'—এই জ্ঞান (বিবেক) সব সাধকের থাকে। কিন্তু এই জ্ঞানকে গুরুত্ব না দিলে তাদের রাগ-দ্বেষ দূর হয় না। দেহে আমিত্ব ও মমিত্ব কখনও কখনও অনুভূত হলেও, তবু সাধকের উচিত তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজ বিবেককে গুরুত্ব দেওয়া, অর্থাৎ 'দেহ আমি নই এবং আমার নয়'—এই সত্যে দৃঢ় থাকা। নিজ বিবেককে গুরুত্ব দিলে তত্ত্বজ্ঞান হয়। জ্ঞান হলে রাগ-দ্বেষ দূর হয়। রাগ-দ্বেষ না থাকলে হৃদয়ে স্বধর্ম ও পরধর্মের জ্ঞান স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায়, এবং চেষ্টা সেই অনুসারে হয়।
'পরধর্মো ভয়াবহঃ'—পরধর্ম পালন বর্তমানে সহজ মনে হলেও, ফলে তা স্বভাবতই ভয়াবহ। মানুষ যদি 'স্বার্থ' ত্যাগ করে পরের মঙ্গলের জন্য স্বধর্ম পালন করে, তবে তার কোনো স্থানেই ভয় থাকে না।
**সন্দেহ:** অষ্টাদশ অধ্যায়ের বিয়াল্লিশ, তেতাল্লিশ ও চুয়াল্লিশ শ্লোকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্যের বিবরণ দিয়ে সাতচল্লিশ শ্লোকের প্রথমার্ধে প্রভু একই কথা বলেছেন ('শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ')। তাই এখানে (বর্তমান শ্লোকে) অন্যের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য ভয়াবহ বলা হলে, অষ্টাদশ অধ্যায়ের বিয়াল্লিশ শ্লোকে উক্ত ব্রাহ্মণের 'স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য'ও অন্যের (ক্ষত্রিয় ইত্যাদির) পক্ষে ভয়াবহ হওয়া উচিত, অথচ শাস্ত্র সব মানুষেরই তা পালনের বিধান দেয়।
**সমাধান:** মন সংযত করা, ইন্দ্রিয় দমন করা ইত্যাদি 'সাধারণ' ধর্ম (গীতা ১৩.৭-১১; ১৬.১-৩) যা সবার পালন করা উচিত; কারণ এগুলো সবার স্বধর্ম। এই সাধারণ ধর্মগুলো ব্রাহ্মণের 'স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য', কারণ তাদের পক্ষে এগুলো পালনে কোনো চেষ্টা লাগে না; কিন্তু অন্যান্য বর্ণের পক্ষে এগুলো পালনে কিছু চেষ্টা লাগতে পারে। স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য ও সাধারণ ধর্ম—দুইই 'স্বধর্ম'-এর অন্তর্গত। সাধারণ ধর্ম ছাড়া, নিজের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্যে পাপ দেখা দিলেও, বাস্তবে তা পাপ নয়; যেমন, বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করা, তা কেবল কর্তব্য বলে জ্ঞান করে (স্বার্থ, বিদ্বেষ ইত্যাদি না রেখে), ক্ষত্রিয়ের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য হওয়ায়, বাস্তবে পাপ দেখা দিলেও পাপ হয় না—'স্বাভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্' (গীতা ১৮.৪৭)।
সাধারণ ধর্ম ছাড়া, অন্যের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য (পরধর্ম) ভয়াবহ; কারণ তার অনুষ্ঠান শাস্ত্রনিষিদ্ধ এবং অন্যের জীবিকা হরণকারী। অন্যের কর্তব্য ভয়াবহ, কারণ তা পালন করলে পাপ হয় এবং বিশেষ স্থান ও বিশেষ প্রকার নরকের ভয় প্রাপ্তি হয়। তাই প্রভু যেন অর্জুনকে বলছেন যে, ভিক্ষান্নে জীবন ধারণ পরের জীবিকা হরণকারী এবং ক্ষত্রিয়ের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ায়, তোমার পক্ষে মঙ্গলজনক নয়; বরং তোমার স্বভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসা যুদ্ধরূপ স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য পালন করাই মঙ্গলজনক।
**স্বধর্ম ও পরধর্ম সম্পর্কে মূল সূত্র:**
পরমাত্মা ও তার অংশ (জীবাত্মা) হল 'আত্মা', আর প্রকৃতি ও তার কার্য (দেহ ও জগৎ) হল 'পর'। আত্মার ধর্ম হল 'স্বধর্ম' আর পরের ধর্ম হল 'পরধর্ম'। তাই সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে, অপরিবর্তনীয়তা, নিষ্কলঙ্কতা, অক্ষয়তা, নিত্যতা, নিষ্কামতা, নিঃস্বার্থতা ইত্যাদি আত্মার সব ধর্মই 'স্বধর্ম'। দেহ ও জগতের জন্ম, জন্মের পর থাকা, পরিবর্তন হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, ক্ষয় পাওয়া, বিনাশ প্রাপ্ত হওয়া এবং ভোগ ও সঞ্চয়ের ইচ্ছা, মানের ইচ্ছা ইত্যাদি দেহ ও জগতের সব ধর্মই 'পরধর্ম'—'সংসারধর্মৈরবিমুহ্যমানঃ' (শ্রীমদ্ভাগবত ১১.২.৪৯)। আত্মায় কখনও কোনো পরিবর্তন হয় না, তাই সে অক্ষয়; কিন্তু দেহ নিরন্তর পরিবর্তিত হয়, তাই সে ক্ষয়শীল। এই দৃষ্টিতে স্বধর্ম অক্ষয় এবং পরধর্ম ক্ষয়শীল।
কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ—এই তিনই স্বপ্রকাশ হওয়ায় স্বধর্ম। স্বধর্মে অভ্যাসের প্রয়োজন হয় না; কারণ অভ্যাস দেহসংক্রান্ত, আর দেহসংক্রান্ত যা কিছু, সবই পরধর্ম।
যোগী হওয়া স্বধর্ম; ভোগী হওয়া পরধর্ম। আসক্তিশূন্য থাকা স্বধর্ম; আসক্ত হওয়া পরধর্ম। সেবা করা স্বধর্ম; কিছু কামনা করা পরধর্ম। প্রেমিক হওয়া স্বধর্ম; আসক্তি সহকারে আকৃষ্ট হওয়া পরধর্ম। নিষ্কাম, নিঃস্বার্থ ও আসক্তিশূন্য হওয়া স্বধর্ম; আর কামনা, স্বার্থ ও আসক্তিযুক্ত হওয়া পরধর্ম। সারকথা, প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক ছাড়া (আত্মায়) যা কিছু হয়, সবই 'স্বধর্ম', আর প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত হয়ে যা কিছু হয়, সবই 'পরধর্ম'। স্বধর্ম চৈতন্যধর্ম; পরধর্ম জড়ধর্ম।
পরমাত্মার অংশ (জীব) হল 'আত্মা', আর প্রকৃতির অংশ (দেহ) হল 'পর'। 'আত্মা'র দুটি অর্থ—এক 'নিজ', আর দুই 'নিজের' অর্থাৎ পরমাত্মা। এই দৃষ্টিতে, নিজ স্বরূপ জ্ঞানের ইচ্ছা ও নিজ পরমাত্মার ইচ্ছা—দুইই 'স্বধর্ম'।
পুরুষের (চৈতন্য) ধর্ম হল: স্বপ্রকাশ
★🔗