BG 3.37 — কর্ম যোগ
BG 3.37ⓘ📚 Go to Chapter 3
श्रीभगवानुवाच|कामएषक्रोधएषरजोगुणसमुद्भवः|महाशनोमहापाप्माविद्ध्येनमिहवैरिणम्||३-३७||
শ্রীভগবানুবাচ | কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ | মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্ ||৩-৩৭||
श्रीभगवानुवाच: The Blessed Lord said | काम: desire | एष: this | क्रोध: anger | एष: this | रजोगुणसमुद्भवः: born of the Rajoguna | महाशनो: all-devouring | महापाप्मा: all-sinful | विद्ध्येनमिह: know | वैरिणम्: the foe
GitaCentral বাংলা▲
শ্রীভগবান বললেন: এটিই কাম, এটিই ক্রোধ; এ রজোগুণ থেকে উৎপন্ন, মহাভক্ষক ও মহাপাপী; একেই এখানে (এই জগতে) তোমার শত্রু বলে জানবে।
★
🙋 বাংলা Commentary▲
শব্দার্থ: কামঃ - ইচ্ছা, এষঃ - এটি, ক্রোধঃ - রাগ, এষঃ - এটি, রজোগুণসমুদ্ভবঃ - রজোগুণ থেকে উৎপন্ন, মহাশনঃ - সব গ্রাসকারী, মহাপাপ্মা - মহাপাপী, বিদ্ধি - জানো, এনম - ইহাকে, ইহ - এখানে, বৈরিণম্ - শত্রু। ভগবান হলেন তিনি যিনি জ্ঞান, বৈরাগ্য, কীর্তি, ঐশ্বর্য, শ্রী এবং বল - এই ছয়টি গুণের অধিকারী। এই পৃথিবীতে সমস্ত পাপ এবং ভুল কাজের মূল কারণ হলো ইচ্ছা। ইচ্ছা পূরণ না হলে মানুষের মনে ক্রোধের সৃষ্টি হয়। এই ইচ্ছা রজোগুণ থেকে জন্ম নেয় এবং মানুষকে কর্মে প্রবৃত্ত করে। তাই জেনে রাখো, এই ইচ্ছাই পৃথিবীতে মানুষের পরম শত্রু।
★
English
Swami Gambirananda
Swami Adidevananda
Hindi
Swami Ramsukhdas
Sanskrit
Sri Ramanuja
Sri Madhavacharya
Sri Anandgiri
Sri Jayatirtha
Sri Abhinav Gupta
Sri Madhusudan Saraswati
Sri Sridhara Swami
Sri Dhanpati
Vedantadeshikacharya Venkatanatha
Sri Purushottamji
Sri Neelkanth
Sri Vallabhacharya
Detailed Commentary▲
**ভগবান্ বলিলেন– এই রাগাত্মিকী কামনা, এই ক্রোধ, ইহাকে জানিও, ইহা মহাভক্ষক, মহাপাপী; এই বিষয়ে ইহাকেই শত্রু বলিয়া জানিও।** **ব্যাখ্যা:** ‘রজোগুণসম্ভব’– পরে চতুর্দশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে ভগবান বলিবেন, রজোগুণের উৎপত্তি হয় তৃষ্ণা (কামনা) ও আসক্তি থেকে। আর এখানে বলছেন, কামনার উৎপত্তি হয় রজোগুণ থেকে। এ থেকে বুঝতে হবে, আসক্তি থেকে কামনার উৎপত্তি হয়, আর কামনা থেকে আসক্তির বৃদ্ধি হয়। অর্থাৎ, জাগতিক বস্তুকে সুখের আকর মনে করার দরুন অন্তরে তাদের প্রতি আসক্তি দৃঢ় হয়। তারপর সেই সব বস্তু সঞ্চয় করবার ও তাদের থেকে সুখভোগ করবার ইচ্ছা জাগে। আবার, কামনা বস্তুর প্রতি আসক্তি বাড়ায়। যতক্ষণ এই চক্র চলতে থাকে, ততক্ষণ পাপাচার থেকে সম্পূর্ণ নিবৃত্তি হয় না। ‘এই কামনা, এই ক্রোধ’– ‘আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হোক’– এটাই কামনা। নশ্বর জড় বস্তু সঞ্চয়ের ইচ্ছা, মিলনজাত সুখের ইচ্ছা, সুখের প্রতি আসক্তি– এ সবই কামনারই রূপ। পাপাচার কখনও ‘কামনা’র বশে, কখনও ‘ক্রোধ’র বশে করা বলে প্রতিভাত হয়। উভয়েই পৃথকভাবে পাপ করে। তাই উভয় শব্দ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে কামনা– অর্থাৎ নশ্বর বস্তুর প্রতি লালসা, অনুরাগ ও আকর্ষণ–ই সমস্ত পাপের মূল। কামনা যখন বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন সেই কামনাই ক্রোধের রূপ ধারণ করে। তাই একটি কামনাই পাপের মূল, একথা নির্দেশ করবার জন্য ভগবান উক্ত শব্দগুলিতে একবচন ব্যবহার করেছেন। কামনা পূর্ণ হলে ‘লোভ’ হয়, আর কামনা বাধাপ্রাপ্ত হলে (বা বাধাদানকারীর প্রতি) ক্রোধ হয়। বাধাদানকারী যদি নিজের চেয়ে শক্তিশালী হয়, তাহলে ‘ক্রোধ’র স্থলে ‘ভয়’ হয়। তাই গীতায় কখনও কখনও কামনা ও ক্রোধের সঙ্গে ভয়েরও উল্লেখ আছে; যেমন– ‘নিরাশীর্নিঃস্পৃহঃ শান্তো… নিঃসঙ্গঃ… নিরহঙ্কারঃ… নির্মমো…’ (৪.১০) এবং ‘বিগতস্পৃহঃ… নিঃসঙ্গঃ… নিরহঙ্কারঃ… নির্মমঃ… শান্তঃ…’ (৫.২৮)। **কামনা সম্পর্কে একটি বিশেষ কথা** কামনা সমস্ত পাপ, দুঃখ, ক্লেশ ইত্যাদির মূল। কামনাযুক্ত ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থায় সুখ পায় না এমনই নয়, স্বপ্নেও কখনও সুখ পায় না– ‘स्पृहा न बुझी, स्वप्नहु न सुखा’ (मानस ७.९०.१)। যেটা কামনা করা হয়, সেটা হয় না, আর যেটা কামনা করা হয় না, সেটাই হয়– এটাকেই দুঃখ বলে। যদি ‘কামনা করা’ ও ‘অকামনা করা’– উভয়ই ত্যাগ করা হয়, তাহলে দুঃখই বা কোথায়? নশ্বর বস্তুর ইচ্ছাই কামনা। নিত্য পরমাত্মার ইচ্ছা কামনার মতো দেখালেও প্রকৃতপক্ষে ‘কামনা’ নয়; কারণ নশ্বর বস্তুর কামনা কখনও পূর্ণ হয় না; বরং বাড়েই, কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা (ঈশ্বরলাভের পর) পূর্ণ হয়। দ্বিতীয়ত, কামনা নিজ থেকে ভিন্ন বস্তুর জন্য হয়, আর ঈশ্বর নিজ থেকে অভিন্ন। সেইরূপ সেবা (কর্মযোগ), তত্ত্বজ্ঞান (জ্ঞানযোগ) ও ঈশ্বরপ্রেম (ভক্তিযোগ) কামনাও ‘কামনা’ নয়। ঈশ্বরলাভের ইচ্ছা প্রকৃতপক্ষে জীবনের সত্যিকারের প্রয়োজন (ক্ষুধা)। আত্মার প্রয়োজন কেবল ঈশ্বরেরই, কিন্তু বিবেক দমিত হলে সে নশ্বর বস্তু কামনা করতে শুরু করে। সন্দেহ হতে পারে: কামনা ছাড়া সংসারকার্য কীভাবে চলবে? সমাধান এই: সংসারকার্য বস্তু ও কর্ম দ্বারা চলে, মনের কামনা দ্বারা নয়। বস্তু কর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, সেই কর্ম অতীতের (প্রারব্ধ) হোক বা বর্তমানের (উদ্যোগ)। কর্ম বাহ্য, আর কামনা আভ্যন্তরীণ। বাহ্য কর্মের ফল (বস্তু, পরিস্থিতি ইত্যাদির আকারে)ও বাহ্য। কামনার ফলের (বস্তু, পরিস্থিতি ইত্যাদির) লাভের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কর্মের অধীনে থাকা বস্তু কীভাবে কামনা করলে লাভ হবে? জগতে দেখি, ধনের কামনা থাকা সত্ত্বেও মানুষের দারিদ্র্য দূর হয় না। মুক্ত মহাত্মাদের ছাড়া অন্য সমস্ত ব্যক্তিই বাঁচবার কামনা নিয়ে মারা যায়। কামনা করুক বা না করুক, যে ফল লাভের জন্য নিয়তি আছে, তা অবশ্যই লাভ হবে। অর্থাৎ, যেটা হওয়ার নিয়তি আছে, সেটা কামনা করলেও হবে, না করলেও হবে; আর যেটা হওয়ার নিয়তি নেই, সেটা কামনা করলেও হবে না, না করলেও হবে না। যেমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি অকামনায় আসে, তেমনই প্রীতিকর পরিস্থিতিও অকামনায় আসবে। রোগ অকামনায় আসে, আর স্বাস্থ্য অকামনায় থাকে। নিন্দা ও অপমান অকামনায় ঘটে, আর প্রশংসা ও সম্মান অকামনায় ঘটে। যেমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কর্মের ফল, তেমনই প্রীতিকর পরিস্থিতিও কেবল কর্মেরই ফল। তাই বস্তু, পরিস্থিতি ইত্যাদির লাভ বা অলাভ কর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, কামনার সঙ্গে নয়। কামনা হতে পারে বর্তমান সুখের জন্য বা ভবিষ্যৎ সুখের জন্য। ভোগ ও সঞ্চয়ের ইচ্ছা বর্তমান সুখের কামনা, আর কর্মফললাভের ইচ্ছা ভবিষ্যৎ সুখের কামনা। এই উভয় কামনায় কেবল দুঃখই আছে। কারণ কামনা কেবল বর্তমানেই দুঃখ দেয় না, ভবিষ্যৎ জন্মের কারণ হওয়ার দরুন ভবিষ্যতেও দুঃখ দেয়। তাই এই উভয় কামনাই ত্যাগ করা উচিত। কর্ম (বিধেয় কর্ম) ও বিকর্ম (নিষিদ্ধ কর্ম) উভয়ই কামনা বশতঃ ঘটে। ‘কর্ম’ কামনা বশতঃ ঘটে, আর কামনা অত্যন্ত বৃদ্ধি পেলে ‘বিকর্ম’ ঘটে। কামনা বশতঃ অস্থির প্রতি আসক্তি দৃঢ় হয়। কামনা না থাকলে অস্থির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। কামনা পূর্ণ হলে আমরা ঠিক সেই অবস্থায় ফিরে আসি, যে অবস্থায় কামনার উৎপত্তির আগে ছিলাম। যেমন, কারও মনে কামনা উঠল: ‘আমার একশো টাকা হোক।’ এর আগে তাঁর মনে একশো টাকা পাওয়ার কোনো কামনা ছিল না; এভাবে অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কামনা উত্থিত হয় এমন একটি বস্তু। যতক্ষণ একশো টাকার কামনা উত্থিত হয়নি, ততক্ষণ ‘নিষ্কামতা’র অবস্থা ছিল। যদি চেষ্টা ও নিয়তি বশতঃ তাঁর একশো টাকা হয়, তাহলে সেই নিষ্কামতার অবস্থা ফিরে আসে। কিন্তু জাগতিক সুখের প্রতি আসক্তি বশতঃ সেই অবস্থা স্থায়ী হয় না, আর নতুন কামনা উঠে: ‘আমার হাজার টাকা হোক।’ এভাবে না কামনা পূর্ণ হয়, না সম্পূর্ণ তৃপ্তি হয়। কেবল পরিশ্রম ছাড়া কিছুই লাভ হয় না! ‘কামনা’ ত্যাগ করা– অর্থাৎ জাগতিক বস্তুর কামনা ত্যাগ করা– কঠিন নয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন: কামনা প্রকৃতপক্ষে ছাড়ে না, না প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী হয় না? দেখা যাবে যে কামনা প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী হয় না! তা নিরন্তর বিনষ্ট হয়; কিন্তু মানুষ নতুন কামনা সৃষ্টি করে তাকে জীবিত রাখে। কামনা উত্থিত হয়, আর যেটা উত্থিত হয়, সেটা অনিবার্যভাবে বিনষ্ট হবে। তাই কামনা আপনাআপনিই বিনষ্ট হয়। মানুষ যদি নতুন কামনা সৃষ্টি না করে, তাহলে পুরোনো কামনা আপনাআপনিই বিনষ্ট হয়, কখনও পূর্ণ হলে, কখনও অপূর্ণ হলে। কামনা পূর্ণ করা সবার জন্য নয় ও চিরকালের জন্য নয়, কিন্তু কামনা ত্যাগ করা সবার জন্য ও চিরকালের জন্য। কারণ কামনা অনিত্য ও ত্যাগ নিত্য। নিষ্কাম হওয়ায় কী কঠিনতা? কঠিনতা এই যে, আমরা নির্মম (নিরহং) হই না। যদি আমরা নির্মম হই, তাহলে নিষ্কাম হওয়ার শক্তি আসবে, আর নিষ্কাম থেকে নির্লিপ্ত (অসঙ্গ) হওয়ার শক্তি আসবে। নির্মমতা, নিষ্কামতা ও নির্লিপ্ততা এলে তখন বিকারমুক্তি, শান্তি ও স্বাধীনতা আপনাআপনিই আসে। একটি মর্মস্পর্শী দিকে মন দিন। আমরা কামনা ত্যাগ করাকে অত্যন্ত কঠিন মনে করি। কিন্তু ভাবুন: যদি কামনা ত্যাগ করা কঠিন হয়, তাহলে কামনা পূর্ণ করা কি সহজ? সমস্ত কামনা পূর্ণ করা আজ পর্যন্ত জগতে কারও হয়নি। আমাদের কথা কী, স্বয়ং ভগবানের পিতা (রাজা দশরথ)ও তাঁর কামনা পূর্ণ করেননি! তাই কামনা পূর্ণ করা অসম্ভব। কিন্তু কামনা ত্যাগ করা অসম্ভব নয়। যদি আমরা ভাবি যে কামনা ত্যাগ করা কঠিন, তাহলে একটি অসম্ভব কাজের (কামনা পূর্ণ করার) তুলনায় একটি কঠিন কাজও সহজ বলে মনে হয়; কারণ কামনা ত্যাগ করা যায়, কিন্তু পূর্ণ করা যায় না। তাই কামনা পূর্ণ করার তুলনায় কামনা ত্যাগ করা সহজ। ভুল এই যে, আমরা যা করতে পারি না, তার জন্য চেষ্টা করি, আর যা করতে পারি, তা করি না। তাই সाधক কামনা ত্যাগ করবেন, যা তিনি করতে পারেন। কামনা চার প্রকার: (১) কেবল দেহধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কামনা পূর্ণ করুন। (২) যে কামনা ব্যক্তিগত ও ন্যায়সংগত, এবং যার পূর্ণ করা আমাদের ক্ষমতার বাইরে– সেটা ঈশ্বরকে অর্পণ করে উচ্ছেদ করুন। (৩) অন্যের যে কামনা ন্যায়সংগত ও হিতকর, এবং যেটা পূর্ণ করার ক্ষমতা আমাদের আছে– সেটা পূর্ণ করুন। এভাবে অন্যের কামনা পূর্ণ করলে আমাদের কামনা ত্যাগ করার শক্তি আসে। (৪) উপরোক্ত তিন প্রকার ছাড়া অন্য সমস্ত কামনা চিন্তা দ্বারা উচ্ছেদ করুন। ‘মহাভক্ষক, মহাপাপী’– এমন শত্রু আছে যে দান, পূজা বা বিনয় দ্বারা শান্ত হয়, কিন্তু এই ‘কামনা’ এমন শত্রু যে কারও দ্বারা শান্ত হয় না। এই কামনা কখনও তৃপ্ত হয় না– ‘बड़े घी सों बुझै नहिं, कह तुलसीदास।’ যেমন ধন পেলে ধনের লোভ কেবল বাড়ে, তেমনই ভোগ যত পাওয়া যায়, কামনা ততই বাড়ে। তাই কামনাকে ‘মহাভক্ষক’ বলা হয়েছে। কামনাই সমস্ত পাপের কারণ। চুরি, ডাকাতি, হিংসা ইত্যাদি সমস্ত পাপ কেবল কামনা বশতঃই ঘটে। তাই কামনাকে ‘মহাপাপী’ বলা হয়েছে। কামনা উত্থিত হলেই মানুষ নিজের কর্তব্য, নিজের স্বরূপ ও নিজের প্রিয়তম (ঈশ্বর) থেকে ফিরে নশ্বর জগতের দিকে ফিরে। নশ্বরের দিকে ফেরার দরুন পাপ হয়, আর পাপের ফলে নরক ও নীচযোনি লাভ হয়। কেবল মিলনজাত সুখের কামনা বশতঃই জগৎ বাস্তব বলে প্রতিভাত হয় ও নিরন্তর পরিবর্তনশীল দেহ ইত্যাদি স্থির বলে প্রতিভাত হয়। জাগতিক বস্তুকে স্থির মনে করে মানুষ তাদের থেকে সুখভোগ করে ও তাদের কামনা করে। সুখভোগের সময় জগতের অনিত্যতার দিকে মন যায় না, আর মানুষ ভোগ ও নিজেকে স্থির দেখে। যে জগৎ প্রতি মুহূর্তে মরছে– বিনষ্ট হচ্ছে– তার থেকে সুখলাভের কামনা কীভাবে হতে পারে? কিন্তু জাগতিক সুখভোগের কামনা কেবল ‘জগৎ প্রতি মুহূর্তে মরছে’ এই জ্ঞানকে উপেক্ষা করেই উত্থিত হয়। সিনেমায় (চলচ্চিত্রে) পাকা আঙুর দেখলে সেগুলি খাওয়ার কামনা হয় না; যদি হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে আমরা সেগুলিকে বাস্তব বলে মনে করেছি। পরিবর্তনশীল জগৎকে স্থির মনে করার দরুন সত্যিকারের স্থির তত্ত্ব, সেই দিব্যতত্ত্ব, বা নিজের স্বরূপের দিকে মন যায়ই না। সেদিকে মন না যাওয়ার দরুন মানুষ সেখান থেকে ফিরে নশ্বর সুখভোগে জড়িয়ে পড়ে। এটা প্রমাণ করে যে, বাস্তব তত্ত্ব থেকে না ফিরে কোনো জাগতিক ভোগই ভোগ করা যায় না, আর জাগতিক ভোগ আসক্তি সহকারে ভোগ করলে মানুষ অবশ্যই ঈশ্বর থেকে ফিরে। যে মানুষ ভোক্তাভাবে জাগতিক বস্তু ভোগ করে, সে হিংসারূপ পাপ এড়াতে পারে না। সে নিজের প্রতি (নিজের পতন) ও অন্যের প্রতি হিংসা করে। যেমন, কোনো মানুষ ধন সঞ্চয় করে ও তা দিয়ে সুখভোগ করলে, তাঁকে দেখে দরিদ্রদের হৃদয়ে ধন ও সুখের অভাবে তীব্র দুঃখ হয়– এটা তাদের প্রতি হিংসা। সুখভোগ করে সে নিজের প্রতি হিংসা (পতন) করে; কারণ স্বয়ং ঈশ্বরের চৈতন্যখণ্ড হয়েও জড়ের (ধনের) প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার দরুন সে কার্যত জড়ের দাস হয়, যার দরুন তার পতন হয়। জগতের সমস্ত ভোগ্যবস্তু সীমিত; তাই মানুষ যত ভোগ করে, সেই ভোগ কেবল অন্যের ভাগ থেকেই আসে। তবে, কেবল দেহধারণের জন্য বস্তু গ্রহণ করলে মানুষের কোনো পাপ হয় না। দেহধারণের মধ্যেও শাস্ত্র কেবল নিজের জন্য বস্তু ভোগ করতে নিষেধ করে। দেহধারণের জন্য বস্তু আগে মাতা, পিতা, গুরু, সন্তান, স্ত্রী, বৃদ্ধ ইত্যাদিকে দিতে হবে, তারপর নিজে নিতে হবে। যে মানুষ ভোক্তাভাবে ভোগ করে, সে নিজের পতন ঘটায়, ভোগ্যবস্তুর অপচয় ও বিনাশ করে ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি হিংসা করে; কিন্তু মুক্ত মহাত্মার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। পাপরূপ হিংসা তাঁর দ্বারা ঘটে না; কারণ তাঁর কোনো ভোক্তাভাব নেই, আর তাঁর দ্বারা কেবল শাস্ত্রবিহিত কর্মই নিষ্কামভাবে কেবল ধারণের জন্য করা হয়। সেই মহাত্মার ব্যবহারে আসা বস্তু উন্নত হয়; সেগুলি বিনষ্ট হয় না– অর্থাৎ, তাঁর কাছে এসে বস্তু সদুপায়ে লাগে, যার দরুন তা সার্থক হয়। যে দেহটি সেই মহাত্মার বলে কথিত হয়, যতক্ষণ তা জগতে থাকে, ততক্ষণ তার দ্বারা প্রাণীদের মঙ্গল আপনাআপনিই ও স্বাভাবিকভাবে ঘটে। কেবল দেহধারণের প্রয়োজন ‘মহাভক্ষক’ ও ‘মহাপাপী’ নয়। কারণ কেবল দেহধারণের প্রয়োজন কামনা নয়। প্রয়োজন পূর্ণ হয়; যেমন– ক্ষুধা উঠল ও আহার করলে তৃপ্তি হল। কিন্তু কামনা বাড়ে। ‘ইহাকেই শত্রু বলিয়া জানিও’– যদিও বাস্তবে কেবল জাগতিক বস্তুর কামনা ত্যাগ করলেই সুখ ও শান্তির অনুভূতি লাভ হয়, তবুও অজ্ঞানতা বশতঃ মানুষ ধারণা করে যে সুখ বস্তু থেকে আসে। এভাবে মানুষ বস্তুর কামনাকে সুখের কারণ মনে করে তাকে নিজের বন্ধু ও হিতৈষী বলে মনে করেছে। এই ধারণা বশতঃ কামনা কখনও বিনষ্ট হয় না। তাই ভগবান এখানে বলছেন: এই কামনাকে বন্ধু বলে জানো না, শত্রু বলে জানো। কামনা মানুষের শত্রু, কারণ তা মানুষের বিবেককে আচ্ছাদিত করে ও তাকে পাপে লিপ্ত করে। জগতের সমস্ত পাপ, দুঃখ, নরক ইত্যাদির মূলে কেবল কামনাই আছে। এই জগতে বা পরজগতে যেখানেই কেউ কষ্ট পাচ্ছে, অস্থির কামনাই তার কারণ। কামনা থেকে সমস্ত প্রকার দুঃখ ঘটে, আর কোনো সুখই ঘটে না। **একটি বিশেষ কথা** কামনা ধ্বংস করার প্রধান ও সহজ উপায় হল– অপরের সেবা করা, তাদের সুখ দেওয়া। অন্য দেহধারী জীবেরাই অন্য; তথাকথিত দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও প্রাণও অন্য। তাই তাদের ধারণাও সেবাভাবে করা উচিত, ভোক্তাভাবে নয়। তাদের থেকে সুখলাভ করা উচিত নয়। কর্মযোগে স্থূলদেহ দ্বারা করা ‘কর্ম’, সূক্ষ্মদেহ দ্বারা করা ‘চিন্তা’ ও কারণদেহের ‘স্থিরতা’– এই তিনই নিজের জন্য নয়, কেবল জগতের জন্য। কারণ স্থূলদেহের স্থূলজগতের সঙ্গে, সূক্ষ্মদেহের সূক্ষ্মজগতের সঙ্গে ও কারণদেহের কারণজগতের সঙ্গে একাত্মতা আছে। তাই দেহ, বস্তু ও কর্ম দ্বারা অপরের সেবা করা উচিত, কিন্তু নিজের মধ্যে সেবকত্বের অহংকার করা অনুচিত। সূক্ষ্মদেহ দ্বারা অপরের মঙ্গল চিন্তা করা উচিত, কিন্তু তা থেকে সুখলাভ করা অনুচিত। কারণদেহ দ্বারা স্থির থাকা উচিত, কিন্তু স্থিরতা থেকে সুখলাভ করা অনুচিত। এভাবে সুখ না নেওয়ার দরুন ফলের প্রতি আসক্তি উচ্ছেদ হয়; ফলের প্রতি আসক্তি উচ্ছেদ হলে কর্মের প্রতি আসক্তি সহজেই উচ্ছেদ হয়। ‘আমার আদেশ চালু হোক’; ‘অমুক ব্যক্তি আমার আদেশ মানুক’; ‘অমুক বস্তু আমার ব্যবহারে আসুক’; ‘আমার মত প্রতিষ্ঠিত হোক’– এ সবই কেবল কামনার রূপ। নশ্বর (অস্থির) জগত থেকে কিছু নেওয়ার কামনা মহাবিপদের কারণ। অন্যের ন্যায়সংগত কামনা (যাতে অন্যের মঙ্গল আছে ও যা পূর্ণ করার ক্ষমতা আমাদের আছে) পূর্ণ করলে আমাদের কামনা ত্যাগ করার শক্তি আসে। আমরা যদি অন্যের কামনা পূর্ণ করতে না পারি, তাহলে তা পূর্ণ করার ভাবনা হৃদয়ে থাকা উচিত। অভিমান– অহংকার (নিজেকে দেহ মনে করা), মমতা (দেহ ইত্যাদি বস্তুকে নিজের মনে করা) ও কামনা (‘অমুক বস্তু লাভ হোক’ এই ভাব)– এই তিনটির দ্বারাই আত্মা জগতে বদ্ধ হয়। অভিমান থেকে সীমাবদ্ধতা, মমতা থেকে বিকার ও কামনা থেকে অশান্তির উৎপত্তি হয়। কামনা ত্যাগ দ্বারা মমতা উচ্ছেদ হয়, আর মমতা ত্যাগ দ্বারা অভিমান উচ্ছেদ হয়। একজন কর্মযোগী নীতিগতভাবে নিজের সঙ্গে এগুলির কোনোটিরই কোনো সম্পর্ক মনে করেন না; কারণ তিনি দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহংকার, বস্তু ইত্যাদিকে নিজের বা নিজের জন্য মনে করেন না; তিনি এই দেহ ইত্যাদিকে কেবল জগতের ও জগতের সেবার জন্য মনে করেন, যা বাস্তবে সেগুলি। কারও কষ্ট না দেওয়ার ভাবনা থাকলেই সেবা শুরু হয়। তাই সাধকের হৃদয়ে ‘কারও কষ্ট না হোক’ এই ভাবনা নিরন্তর থাকা উচিত। যদি ভুলবশতঃ আমাদের দ্বারা কারও কষ্ট হয়, তাহলে আমরা ক্ষমা চাইব। তারা ক্ষমা না করলেও ভয় নেই। কারণ, যিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান, তাঁর ক্ষমা ঈশ্বরের তরফ থেকে আপনাআপনিই হয়। সেবা করতে গিয়ে সাধকের সদা সতর্ক থাকা উচিত যে সেবার বিনিময়ে কিছু নেওয়ার ভাবনা তাঁর মধ্যে না উঠে। এভাবে সেবা করলে কামনারূপ শত্রু সহজেই ধ্বংস হয়। **সন্দর্ভ:** ‘এটা পাপ’ জেনেও মানুষ পাপে লিপ্ত হয়; তাই এই জ্ঞানের আচরণে প্রভাব না পড়ার কারণ কী? ভগবান পরের দুটি শ্লোকে তার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
★
↑